২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপার কাগজ কেনাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একশ্রেণির কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী কাগজ সরবরাহকারী সিন্ডিকেটের যোগসাজশে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কাগজ না কিনলে অনেক ছাপাখানার কাগজ অনুমোদন আটকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাজারদরের তুলনায় টনপ্রতি প্রায় ২২ হাজার টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ছাপাখানার কাগজ অনুমোদন নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গিয়াস উদ্দিন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার জন্য নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাগজ সংগ্রহ করেন। কিন্তু কাগজ পরীক্ষার পরও এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট দল অনুমোদন দেয়নি। পরে আগের তুলনায় নিম্নমানের কাগজ একটি প্রভাবশালী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনলে দ্রুত অনুমোদন মেলে। এতে প্রতি টনে অতিরিক্ত ২২ হাজার টাকা গুনতে হয় তাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এভাবে প্রায় ২৫ হাজার টন কাগজ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছে বিভিন্ন ছাপাখানাকে। এতে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার বাড়তি অর্থ আদায় হয়েছে। অথচ সিন্ডিকেটের সরবরাহ করা কাগজের বাজারমূল্য টনপ্রতি ১ লাখ ৩ হাজার টাকা হলেও ছাপাখানাগুলোকে তা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।
এনসিটিবির পাঠ্যবই পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, গিয়াস উদ্দিনের কেনা কাগজ পরীক্ষায় মানসম্মত পাওয়া গেলেও অজ্ঞাত কারণে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীর নজরে এলে তার হস্তক্ষেপে ৯০০ টন কাগজের অনুমোদন পায় একটি ছাপাখানা। এ ঘটনায় সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ কিছুটা কমেছে বলে জানা গেছে।
মুদ্রণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী আলোচিত জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসায়িক অংশীদারদের একটি চক্র পাঠ্যবই ছাপার কাগজ সরবরাহ ও কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে। মাতুয়াইলে অবস্থিত পাঁচটি ছাপাখানার মালিকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ই-টেন্ডারের দর নির্ধারণ থেকে শুরু করে কাজ ভাগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এবারও পাঠ্যবই ছাপার বড় অংশের কাজ পেয়েছে।
এদিকে কাগজের অনুমোদন না দেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি ছাপাখানার লোকজন এনসিটিবির এক পরিদর্শন এজেন্টের মালিককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছেও হুমকি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তিনি এনসিটিবির একজন সদস্যকে জানিয়েছেন। তবে সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই নতুন শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার কাজ এগিয়ে চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২৪ ডিসেম্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বই দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এবার প্রথমবারের মতো বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ প্রায় ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে অগ্রগতি ৭২ দশমিক ১৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপার কাজ ৯৬ দশমিক ০৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপার অগ্রগতি ৯২ শতাংশের বেশি হলেও অষ্টম শ্রেণিতে ৬৬ দশমিক ৬২ এবং নবম-দশম শ্রেণিতে ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
কাজের অগ্রগতি বাড়াতে ৩২টি ছাপাখানাকে চিঠি দিয়ে তাগাদা দিয়েছে এনসিটিবি। বইয়ের মান যাচাই ও উৎপাদন পর্যবেক্ষণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিটিবির সমন্বয়ে ৫৩টি দল কাজ করছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ছাপার কাজ শেষ করা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার্থীরা এবার উন্নত মানের বই পাবে।