দীর্ঘদিনের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট থেকে এখনও পুরোপুরি বের হতে পারেনি ন্যাশনাল ব্যাংক। তারল্য সংকটের কারণে অনেক গ্রাহক প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা ব্যাংকটির পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট ঋণ ৪২ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা।
নগদ অর্থের চাপ সামলাতে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৯০ দিনের জন্য ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ১ হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা পেয়েছে ব্যাংকটি। ডিমান্ড প্রমিসরি নোটের বিপরীতে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আমানত প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে নিজেদের উৎস থেকে প্রয়োজনীয় তারল্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে নগদ উত্তোলনের চাপ বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বড় অঙ্কের টাকা তুলতে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় এটিএম থেকেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ অন্য ব্যাংকের এটিএম ব্যবহার করেও সীমিত পরিমাণ টাকা তুলতে পারছেন।ব্যাংকের এক গ্রাহক জানান, বেতন হিসাবে টাকা জমা হওয়ার পরও অনেক সময় এটিএম থেকে অর্থ তুলতে পারেননি। আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, ১৫ হাজার টাকার চেক নগদায়ন করতে শাখায় দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো দুর্বল ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করা সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই স্থায়ী সমাধানের পথ।
দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থাপনা সংকট
ন্যাশনাল ব্যাংক একসময় দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে অনিয়ম, বেনামি ঋণ, কমিশনের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ ও নিয়োগসংক্রান্ত নানা অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েও পরিবর্তন আসে।২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলেও আর্থিক অবস্থায় প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ২৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদেও দীর্ঘদিন স্থিতিশীলতা দেখা যায়নি। গত পাঁচ বছরে ভারপ্রাপ্তসহ ছয়জন এমডি পদত্যাগ, বাধ্যতামূলক ছুটি অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন।
২০২১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে এ এস এম বুলবুলকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শাহ সৈয়দ আবদুল বারী দায়িত্ব নেন। একই বছরের ডিসেম্বরে মেহমুদ হোসেন এমডি হন এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও দায়িত্বে ফেরেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মো. তৌহিদুল আলম খানকে এমডি ও সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি এক বছরের মধ্যেই দায়িত্ব ছাড়েন। পরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আদিল চৌধুরী দায়িত্ব নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনিও ইতোমধ্যে অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করছেন ইমরান আহমেদ। তার দাবি, আমানতকারীদের সহযোগিতা এবং সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় ব্যাংকটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
তার ভাষ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের সামগ্রিক আকারের তুলনায় বড় কোনো অর্থ নয়; মূলত আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে সহায়তার জন্যই এটি দেওয়া হয়েছে। তবে সহায়তার খবর প্রকাশের পর উল্টো টাকা তোলার চাপ বেড়েছে বলেও তিনি জানান।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, ছোট অঙ্কের টাকা উত্তোলনে বড় সমস্যা নেই। তবে বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে তুলতে চাইলে গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে পরিশোধের সময়সূচি ঠিক করতে হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের কর্মীদের বেতন ও বড় আমদানি বিল পরিশোধের সময় তারল্য ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর করে কোনো ব্যাংক দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ন্যাশনাল ব্যাংককে খেলাপি ঋণ আদায়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে আমানতকারীদের চাহিদা পূরণ করা যায়।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফ সম্প্রতি দুর্বল ২৯টি ব্যাংককে নতুন করে তারল্য সহায়তা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই তালিকায় ন্যাশনাল ব্যাংকও রয়েছে।
পাঁচ বছরে ছয় এমডি, সংকট কাটছে না ন্যাশনাল ব্যাংকের
দীর্ঘদিনের আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট থেকে এখনও পুরোপুরি বের হতে পারেনি ন্যাশনাল ব্যাংক। তারল্য সংকটের কারণে অনেক গ্রাহক প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং ব্যবস্থাপনায়
প্রিয় বাংলাদেশঅর্থনীতি


