আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আগের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছর মেয়াদি এ কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়ার বিষয়ে কথা হচ্ছে। আলোচনা সফলভাবে এগোলে আগামী ডিসেম্বর মাসে চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।নতুন ঋণের শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন কর্মসূচির আওতায় এসব সংস্কার কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়েও দর-কষাকষি চলছে।আগামী সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাত দিনব্যাপী বার্ষিক সভা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেবে। সভার ফাঁকে আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বারোপ
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, করছাড় কমানো এবং ভর্তুকি যৌক্তিক করার মতো বিষয়ে আগের কর্মসূচিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও আইএমএফ একই ধরনের সংস্কারের শর্ত দিতে পারে।তিনি মনে করেন, সংস্কার কার্যক্রম দীর্ঘদিন আটকে রেখে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া কার্যকর সমাধান নয়। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দরকার। তাঁর মতে, রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি সীমিত থাকায় ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ বাড়ছে।
আগের ঋণ কর্মসূচি থেকে নতুন উদ্যোগ
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কর্মসূচি অনুমোদন করে আইএমএফ। এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঋণসহায়তা চেয়ে সংস্থাটিকে চিঠি দিয়েছিল। পুরোনো কর্মসূচির সাতটি কিস্তির মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে।পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের জুনে কর্মসূচিটির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নের জটিলতার কারণে বর্তমান সরকার আগের কর্মসূচি আর এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় সরকার নতুন কর্মসূচির আগ্রহের কথা জানায়। এরপর ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য চিঠি পাঠানো হয়। আইএমএফও নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, আগের কর্মসূচির সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলো নতুন ঋণের আলোচনাতেও রয়েছে। তবে নতুন কর্মসূচিতে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় পাওয়া যেতে পারে।
সম্ভাব্য শর্তে যেসব বিষয় রয়েছে
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে মে মাস থেকে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। কখনো সরাসরি, আবার কখনো ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য শর্তের মধ্যে রয়েছে—
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে আরও বেশি বাজারনির্ভর করা;
রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পৃথক করা;
বিভিন্ন ধরনের করছাড় পর্যালোচনা করে যৌক্তিক করা;
দেউলিয়া-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন;
সরকারি বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো বা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা। আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সফরে ঋণের শর্ত এবং সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। এরপর চূড়ান্ত দর-কষাকষির মাধ্যমে ডিসেম্বর মাসে ঋণচুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
আগের কর্মসূচির শর্ত পূরণে ঘাটতি
আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে মোট ৫৫০ কোটি ডলার পাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে কিস্তি ছাড়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কয়েকটি সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। এর কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও অনেক শর্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূরণ হয়নি।২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামো পরিবর্তন করে রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে মোট ৫৫০ কোটি ডলার পাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে কিস্তি ছাড়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কয়েকটি সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। এর কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও অনেক শর্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পূরণ হয়নি।২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামো পরিবর্তন করে রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের বিভাগ আলাদা করার শর্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি। বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন করছাড় যৌক্তিকভাবে প্রত্যাহার এবং প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও ছিল। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্তও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ব্যাংক খাতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন প্রণয়ন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগসহ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানো বা যৌক্তিক করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত রয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে ভর্তুকির পরিমাণ বরং বেড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। আসন্ন বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। একই সঙ্গে ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর আগের বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন।নতুন ঋণ কর্মসূচির চূড়ান্ত আকার, শর্ত ও চুক্তির সময়সীমা নির্ভর করবে চলমান আলোচনার ওপর। ফলে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ এখনো সম্ভাব্য প্রস্তাব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই পক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রয়োজন।




