স্থানীয় কাঁচামাল, আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে উচ্চমূল্য সংযোজনের পণ্য তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানো এবং উৎপাদকদের সরাসরি বড় বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতেও নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।বিসিকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ জানিয়েছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’, ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’, ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ এবং ‘বিসিক বাজার’-এর মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিসিকের আওতাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে ভ্যাট ও কর বাবদ জাতীয় রাজস্বে এসব শিল্পের অবদান ছিল ৪ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। বর্তমানে বিসিকের আওতায় ৮৮৭টি শিল্প ইউনিট রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রশিক্ষণ

দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিসিকের ১৫টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্যোক্তা ও দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করছে। বর্তমানে তিন মাস মেয়াদি ১৮০ ঘণ্টা এবং ছয় মাস মেয়াদি ৩৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

শুধু উৎপাদন দক্ষতা নয়, পণ্যের মান ও নকশা উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিসিকের কেন্দ্রীয় নকশা কেন্দ্র চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য, ব্লক-বাটিক ও মৃৎশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যের নকশা নিয়ে কাজ করছে।

নিজস্ব নকশা ও ব্র্যান্ড তৈরিতে গুরুত্ব

বিসিক চেয়ারম্যানের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই বিদেশি নকশা অনুসরণের পরিবর্তে নিজস্ব নকশা, ব্র্যান্ড ও পেটেন্ট তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে উদ্যোক্তাদের।এ লক্ষ্যেই ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ডিজাইনারদের যুক্ত করা হচ্ছে।

‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচি

গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিচিত ও সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোকে ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, এ উদ্যোগ শুধু জিআই পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থানীয়ভাবে তৈরি এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন ও মান উন্নয়ন করা গেলে দেশি-বিদেশি বাজারে সেগুলোর চাহিদা তৈরি করা সম্ভব।

স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারে মূল্য সংযোজন

সস্তা শ্রম ও কম মূল্যের গ্যাসের ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে উল্লেখ করে বেনজীর আহমেদ স্থানীয় কাঁচামাল কাজে লাগিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।

কলাগাছ ও আনারসের ফাইবার, কচুরিপানা ও হোগলা পাতার মতো স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে আধুনিক ডিজাইনের পণ্য তৈরির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, এসব পণ্যে প্রযুক্তি ও আধুনিক নকশা যুক্ত করা গেলে রপ্তানি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব।

উৎপাদক-ক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় সমস্যা হিসেবে পণ্য বাজারজাতকরণের বিষয়টি উল্লেখ করে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, অনেক উদ্যোক্তা ভালো পণ্য তৈরি করলেও সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন না।

এ সমস্যা দূর করতে একটি কেন্দ্রীয় বাজার ‘বিসিক বাজার’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিসিকের সাবকন্ট্রাক্টিং কার্যক্রম সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।