আন্তর্জাতিক কল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্টকমের কার্যক্রম ও নিয়ন্ত্রক সুবিধা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এস আলমের মালিকানাধীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা এই কোম্পানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের কেউ কেউ। তাঁদের অভিযোগ, বকেয়া পরিশোধ ও ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত পূরণ না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে বিটিআরসির চেয়ারম্যান এ ধরনের পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিটিআরসির জারি করা একটি নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে বিতর্কটি নতুন করে সামনে আসে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটররা পৃথকভাবে কমন ইন্টারন্যাশনাল পয়েন্ট (সিআইপি) ও ইন্টার অপারেটর এক্সচেঞ্জ (আইওএক্স) সুইচ স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
 আগে অপারেটররা সম্মিলিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ ধরনের সেবা দিয়ে আসছিলেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, যৌথ প্ল্যাটফর্মে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে অপারেটরদের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ভাগাভাগি এবং দৈনন্দিন লেনদেনের স্বচ্ছতা যাচাই করা তুলনামূলক সহজ ছিল। এ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল আগাম ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়া। কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায় তৈরি হলে সরকারের পাওনা সুরক্ষিত রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য। অভিযোগ রয়েছে, ফার্স্টকম ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়াই যৌথ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাছে অন্যান্য অপারেটরের প্রায় আড়াই কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। এসব পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার শর্ত পূরণ না হওয়ায় কোম্পানিটিকে প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার বিষয়ে অন্য অপারেটরদের আপত্তি ছিল। অপারেটরদের আশঙ্কা ছিল, বকেয়া নিষ্পত্তি ও আর্থিক নিশ্চয়তা ছাড়া ফার্স্টকমকে পুনরায় যৌথ ব্যবস্থায় যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে নতুন দায় তৈরি হতে পারে। এতে পাওনা আদায় কঠিন হওয়ার পাশাপাশি পুরো খাতে শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও তাঁরা মনে করেন। 
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বকেয়া পরিশোধ না করা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বিটিআরসি ফার্স্টকমের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। পরে ২০২৫ সালের ২৫ মে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, ৩১ জুলাই ২০২৫-এর মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটি নতুন টপোলজিতে অংশ নিতে পারবে না। তবে একই বছরের ২ ডিসেম্বর ফার্স্টকমের ওপর আরোপ করা ১০০ শতাংশ অপারেশনাল ক্যাপ তুলে নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের প্রশ্ন, বকেয়া পুরোপুরি নিষ্পত্তি না হওয়ার পরও কীভাবে এ বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এ নিয়ে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ বিটিআরসির প্রকাশিত সভার কার্যবিবরণীও বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই নথিতে ফার্স্টকম, আইজিডব্লিউ অপারেটর ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের দাবি, তাঁদের সঙ্গে এ ধরনের কোনো সমঝোতা হয়নি।
 এ কারণে তাঁরা কার্যবিবরণী নিয়ে আপত্তি তোলেন এবং জালিয়াতির অভিযোগ করেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই। এর পরদিন, ১৬ মার্চ ২০২৬, ফার্স্টকমকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ফার্স্টকমের ৭৭ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিকানা এস আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেনামি মালিকানার অধীনে রয়েছে। বাকি শেয়ারের মালিক হিসেবে সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও তাঁর পরিবারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর স্পেশাল জজ আদালত এস আলম ও তাঁর পরিবারসংশ্লিষ্ট ৪২টি কোম্পানির অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 
তালিকায় থাকা জেনেসিস টেক্সটাইল ও লায়ন সিকিউরিটিজ কোম্পানি লিমিটেডকে ফার্স্টকমের বড় শেয়ারধারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আদালতের ওই আদেশের পরও ফার্স্টকম কীভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কমিশন কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য কাজ করে না। তাঁর ভাষ্য, প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই আইজিডব্লিউ অপারেটরদের বিষয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।