ঝিনাইদহে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাতটি সরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে। কোথাও চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, কোথাও অনুমোদিত সব পদই শূন্য। শিক্ষকসংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম, আবার কোথাও বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে থেকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
এর মধ্যে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি খাবার স্যালাইন ফ্যাক্টরি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। সদর হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালু না হওয়ায় বঞ্চিত হচ্ছেন হৃদ্‌রোগীরা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে নির্মিত এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থে গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো থেকে জনগণ প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে দিনকে দিন দীর্ঘ হচ্ছে ভোগান্তি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝিনাইদহ সরকারি খাবার স্যালাইন ফ্যাক্টরি, সদর হাসপাতালের সিসিইউ, সরকারি শিশু হাসপাতাল, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস), ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি), আঞ্চলিক নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং মুক ও বধির আবাসিক স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকট চলছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েকটি সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালালেও প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না।
এদিকে প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি খাবার স্যালাইন ফ্যাক্টরি দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর বাতিল হয়ে গেছে। সদর হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার সিসিইউ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে চালু করা যায়নি। ফলে হৃদ্‌রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখনো স্বপ্নের মতোই অধরা যা বাস্তব রূপ পায়নি।
প্রয়াত সাবেক বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি মসিউর রহমানের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ২০০৫ সালের ৭ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম খালেদা জিয়া ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। কাজ শেষ করে ২০০৬ সালের ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রাশুরু করা দেশের জেলা পর্যায়ে নির্মিত প্রথম বিশেষায়িত ২৫ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি শিশু হাসপাতালেও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে শিশুদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, ঝিনাইদহ ম্যাটসের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত ১০৪টি পদের সব কটিই শূন্য। সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই মাত্র দুজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে ১৫৬ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শিক্ষকসংকটের কারণে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
আইএইচটির গুরুত্বপূর্ণ আটটি পদ শূন্য রয়েছে
রেডিওলজি ও রেডিওথেরাপি ল্যাবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আঞ্চলিক নার্সিং ইনস্টিটিউটেও রয়েছে জনবলসংকট। এতে স্বাস্থ্য খাতের জনবল তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এদিকে, নয় বিঘা জমির ওপর নির্মিত খুলনা বিভাগের একমাত্র মুক ও বধির আবাসিক স্কুলের নয়টি স্থায়ী পদের মধ্যে ছয়টিই শূন্য। ধার করা তিনজন শিক্ষক এবং নিয়মিত বেতন না পাওয়া আউটসোর্সিং কর্মচারীদের দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার অভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি প্রফেসর (অবঃ) মহব্বত হোসেন টিপু বলেন, ঝিনাইদহের সাতটি সরকারি প্রতিষ্ঠান জেলার মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিশেষায়িত সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠান সচল থাকলে জেলার পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও উপকৃত হবেন। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসা, হৃদ্‌রোগীদের সেবা, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি এবং বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে পড়ে থাকা দুঃখজনক। জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত সংকট নিরসন করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা।
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান সোহেল বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর চালুর পর প্রশাসনিক জটিলতায় ম্যাটস ও আইএইচটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে শিশু হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট সীমিত জনবল নিয়ে চলছে। খাবার স্যালাইন ফ্যাক্টরি ও সিসিইউ চালুর বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জেলার জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি ৭ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন প্রিন্স বলেন, জনগণের অর্থে নির্মিত এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানের যথাযথ ব্যবহার ও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। 
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা, জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট এবং পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো, বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে জনগণের সেবার মানোন্নয়ন করা।