বিদেশি রাষ্ট্রের তৎপরতা, সন্ত্রাসবাদ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার—এই তিন দিক থেকে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর প্রধান স্যার কেন ম্যাককালাম। তার মতে, গত ১০ বছরে বিদেশি প্রতিপক্ষের হুমকি চার গুণ বেড়েছে। এসব মোকাবিলায় স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের চেয়েও বেশি সম্পদ কাজে লাগাতে হচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাটিকে।
লন্ডনে এমআই৫-এর সদর দপ্তরে বার্ষিক বক্তব্যে তিনি রাশিয়াকে যুক্তরাজ্যের জন্য প্রধান আগ্রাসী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। ইরান-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে ইহুদি সম্প্রদায় ও সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানান। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাইবার হামলা ও সন্ত্রাসী তৎপরতার ধরন বদলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ তুলে স্যার কেন বলেন, মস্কো সাইবার হামলা, নাশকতা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মতো কৌশল ব্যবহার করছে। সরাসরি যুদ্ধের বাইরে থেকে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির এ পদ্ধতিকে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলা হয়।
তার দাবি, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর প্রায় এক হাজার রুশ কূটনীতিক ও গোয়েন্দা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বহিষ্কার করায় বিভিন্ন দেশে মস্কোর গোপন নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়েছে। ফলে এখন অপরাধীদের অর্থ দিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করছে রাশিয়া।
২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রসঙ্গে এমআই৫ প্রধান বলেন, রুশ গণমাধ্যম ও অনলাইন ট্রল-বটের মাধ্যমে বিতর্কে প্রভাব ফেলার চেষ্টা হয়েছিল বলে প্রকাশ্য তথ্য রয়েছে। তবে এ ধরনের চেষ্টা গণভোটের ফল নির্ধারণে সফল হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
ইরান-সংশ্লিষ্ট তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্যার কেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইহুদি সম্প্রদায় এবং সামরিক স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক তিনটি ভ্যানের অবস্থান নিয়ে তদন্তের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে ইরানের আগ্রহের আরও নজির রয়েছে। ওই ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ঘটনাটির সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুললেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানাননি এমআই৫ প্রধান।
বিদেশি রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। চীন, ইরান ও রাশিয়াসংশ্লিষ্ট হুমকি মোকাবিলায়ও এ আইন ব্যবহার করা হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন চ্যালেঞ্জ
এআই ব্যবহার করে উগ্রবাদী প্রচারণা তৈরি, নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ও হামলার পরিকল্পনা উন্নত করার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন স্যার কেন। এআই-সক্ষম ড্রোন এবং জৈব অস্ত্রের অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। তবে জৈব অস্ত্রের ক্ষেত্রে এআই-সৃষ্ট ঝুঁকি এখনো আশঙ্কার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে উল্লেখ করেন।
সম্ভাব্য হুমকি যাচাই করতে এমআই৫ নতুন একটি এআই হুমকি মূল্যায়ন কেন্দ্র চালু করেছে। পাশাপাশি এমআই৬ ও সরকারি যোগাযোগ নিরাপত্তা সদর দপ্তর দেশটির এআই নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানান এমআই৫ প্রধান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবার সন্ত্রাসবাদী হুমকির মাত্রা ‘গুরুতর’ করা হয়। আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো সংগঠনগুলোর পাশাপাশি উগ্র ডানপন্থী সন্ত্রাসবাদও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব থেকে সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা এবং অনলাইনে তরুণদের উগ্রবাদে প্রভাবিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, ১৩ বছর বয়সী এক শিশুকে নিয়ে এমআই৫-এর তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে একটি প্রাণঘাতী হামলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।
স্যার কেনের মতে, বিদেশি রাষ্ট্রের তৎপরতা, সন্ত্রাসবাদ ও প্রযুক্তির অপব্যবহার মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এখন আগের চেয়ে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করতে হচ্ছে।