রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি তেলের চুক্তি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা এবং অভিবাসনবিরোধী অভিযানে গুলিবর্ষণ—তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার যুক্তিতে তাঁর প্রশাসন কত দূর যেতে পারে এবং এসব সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষক স্টিফেন কলিনসনের প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপের পেছনে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের পক্ষে থাকা মার্কিন নাগরিকদের সমর্থনও রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত করতে পশ্চিমা দেশগুলো বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে রাশিয়ার অর্থনীতি ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সুবিধা পেতে পারেন। ইউক্রেনের জন্যও সিদ্ধান্তটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্ব নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং ইউক্রেনের জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টিও ওয়াশিংটনের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।
তবে চুক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপও রয়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ও পরিবহন খাতের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব খাদ্যপণ্যের দামেও পড়ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এ চাপ বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রিপাবলিকান নেতা টম এমার সিদ্ধান্তটিকে মার্কিন নাগরিকদের সহায়তায় নতুন পথ খোঁজার প্রচেষ্টা হিসেবে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের মতে, রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে সহায়তা করতে পারে। ফলে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে ডিজেলের দাম দ্রুত কমবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
মৃত্যুদণ্ড সম্প্রচার নিয়ে আপত্তি
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে গুলিবর্ষণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনাও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ওই ঘটনায় ১৩টি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে হাসান দোষী সাব্যস্ত হন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের যুক্তি, গুরুতর অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে বোঝানো প্রয়োজন। তবে সমালোচকদের মতে, মৃত্যুদণ্ডকে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রদর্শন করা যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি পরিকল্পনাটিকে মধ্যযুগীয় চর্চার সঙ্গে তুলনা করেছেন। রিপাবলিকান প্রতিনিধি অস্টিন স্কট মৃত্যুদণ্ডের সমর্থক হলেও সরাসরি সম্প্রচারের বিরোধিতা করেছেন। ইউটার সিনেটর জন কার্টিসের আশঙ্কা, এতে মৃত্যুদণ্ড বিনোদনের উপকরণে পরিণত হতে পারে এবং উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো প্রচারের সুযোগ পেতে পারে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
অভিবাসন অভিযানে গুলিবর্ষণ
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের ২৮ বছর বয়সী নাগরিক অস্কার বেলগাল আহত হওয়ার ঘটনাও বিতর্ক বাড়িয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় তাঁর পাঁচ বছর বয়সী সন্তান গাড়িতে ছিল। শিশুটি আহত না হলেও বেলগালের ঘাড়ে উপরিভাগে ক্ষত হয়।
কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, কর্মকর্তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন বলে মনে করেছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, বেলগাল আগে বড় অঙ্কের সম্পদ চুরির একটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছিলেন এবং পাঁচ বছরের পরীক্ষামূলক মুক্তির সাজা পেয়েছিলেন।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি অভিযানের সমালোচনা করে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইউনিফর্ম পরিহিত ছিলেন না এবং এ ধরনের তৎপরতায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিনের দাবি, বেলগালের আচরণ পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল।
অভিবাসন নীতির সমর্থকেরা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগে কঠোরতার পক্ষে। তবে অভিযানের পদ্ধতি এবং বলপ্রয়োগের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পিউ রিসার্চ সেন্টারের মে মাসের জরিপে দেখা যায়, ৫২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি করছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে এ মতের হার ১৯ শতাংশ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাবের প্রশ্ন
ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন নিয়ে বিতর্কের রাজনৈতিক প্রভাব আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে কতটা পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্য, আবাসন ব্যয়, ইরান যুদ্ধসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ইস্যুও ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখবে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে মূলত সরকারি ক্ষমতার সীমা, আইন প্রয়োগে বলপ্রয়োগের গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক মিত্রদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং বিশ্বে দেশটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা তাঁর কঠোর নীতিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে দেখলেও সমালোচকেরা এসব পদক্ষেপের আইনি, নৈতিক ও কূটনৈতিক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। শেষ পর্যন্ত এসব নীতির প্রতি জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক চাপের মাত্রাই নির্ধারণ করবে, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানে পরিবর্তনের দাবি কতটা জোরালো হয়।
সূত্র: সিএনএন, স্টিফেন কলিনসন