রান্নার জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ে যখন চাপে সাধারণ মানুষের সংসার, তখন মুরগির বিষ্ঠা থেকে তৈরি জৈব গ্যাস হতে পারে সাশ্রয়ের বিকল্প। পোলট্রি খামারের বর্জ্য কাজে লাগিয়ে রান্নার গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি তৈরি করা সম্ভব জৈব সার। এতে বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশদূষণ কমানো এবং খামারিদের বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা খরচের হিসাবটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; সব খামার বা পরিবারের জন্য একই ব্যয় হবে না।
বর্জ্য থেকেই জ্বালানি
মুরগির বিষ্ঠা যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে দুর্গন্ধ ছড়াতে পারে এবং পরিবেশ দূষিত হতে পারে। কিন্তু বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে এই বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়। এ ব্যবস্থায় বায়ুরোধী ট্যাংকে মুরগির বিষ্ঠা ও পানি দেওয়া হয়। অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে অণুজীব জৈব পদার্থ ভেঙে গ্যাস তৈরি করে। পরে পাইপের মাধ্যমে সেই গ্যাস রান্নার চুলায় সরবরাহ করা যায়।
জৈব গ্যাসের প্রধান জ্বালানিযোগ্য উপাদান মিথেন। তবে কতটা গ্যাস উৎপাদিত হবে, তা নির্ভর করে বিষ্ঠার পরিমাণ ও গুণমান, তাপমাত্রা, প্ল্যান্টের আকার এবং ব্যবস্থাপনার ওপর। তাই সব খামারে একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া সম্ভব নয়।
সিলিন্ডার গ্যাসের বিকল্প
গ্রামাঞ্চলের যেসব পরিবার পাইপলাইনের গ্যাস পায় না, তাদের অনেকেই রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। নিয়মিত বিপুল পরিমাণ বিষ্ঠা পাওয়া যায়—এমন পোলট্রি খামারে বায়োগ্যাস উৎপাদন করলে খামারের নিজস্ব জ্বালানির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আশপাশের পরিবারেও সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে প্ল্যান্ট স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, পাইপলাইন, গ্যাসের উৎপাদনক্ষমতা এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে। ফলে মাসে ১ হাজার ২০০ টাকায় গ্যাস পাওয়ার হিসাবটি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
গ্যাসের পরও পাওয়া যায় সার
বায়োগ্যাস তৈরির পর ট্যাংকে থাকা অবশিষ্ট পদার্থ যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এতে একই কাঁচামাল থেকে রান্নার জ্বালানি ও কৃষিকাজের উপযোগী সার—দুই ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তবে জমিতে ব্যবহারের আগে অবশিষ্ট পদার্থের গুণমান ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
পোলট্রি খামারের বর্জ্য থেকে গ্যাস উৎপাদন খামারিদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত গ্যাস স্থানীয় পরিবারে সরবরাহ করা গেলে তা আয়ের উৎস হতে পারে। তবে এ উদ্যোগের আগে দৈনিক বিষ্ঠার পরিমাণ, প্রয়োজনীয় প্ল্যান্টের আকার, সম্ভাব্য গ্রাহক ও বিনিয়োগের হিসাব করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তায় সতর্কতা জরুরি
বায়োগ্যাস উৎপাদনে সম্ভাবনা থাকলেও এর ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা প্রয়োজন। নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ, ট্যাংক ও পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে। মিথেন দাহ্য হওয়ায় গ্যাসের লিকেজ থেকে আগুন বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই প্রশিক্ষিত কারিগরের মাধ্যমে প্ল্যান্ট স্থাপন, নিয়মিত লিকেজ পরীক্ষা ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
দেশে পোলট্রি খাতের বিস্তারের সঙ্গে মুরগির বিষ্ঠা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও বাড়ছে। পরিকল্পিতভাবে এই বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর করা গেলে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় বিকল্প জ্বালানির সুযোগ বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত সাশ্রয় নির্ধারণে প্রাথমিক বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়সহ পূর্ণাঙ্গ হিসাব জরুরি।