রাজধানীর নাগরিক সমস্যা সমাধান, দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী জানিয়েছেন, ঢাকায় শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য শহর ও স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে রাজধানীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট তুলে ধরেন নাসীরুদ্দিন। তার অভিযোগ, গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে বিকল্প উপায়ে রান্না করতে হচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার এলপিজি সিলিন্ডার বাজারে কোথাও ২ হাজার ৫০০, আবার কোথাও ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চকবাজারের বাসিন্দাদের জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, মুগদা হাসপাতালে সিন্ডিকেট ও দরপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উত্তরা ও মিরপুরে বিভিন্ন সমস্যা দেখেছেন তারা। মিরপুরে রাড্ডার হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। যাত্রাবাড়ীতে প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেন।
তার ভাষ্য, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আবর্জনার স্তূপ, যানজট, নর্দমার পানি ও অটোরিকশার আধিক্য নাগরিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এসব সমস্যা থেকে নগরবাসীকে মুক্ত করার লক্ষ্যেই তাদের আন্দোলন।
বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের হত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ কার্যকরের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান নাসীরুদ্দিন। তিনি বলেন, সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে তাদের সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দলটি কাজ করে যাবে। ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতির কথা জানান এনসিপির এই নেতা। তার দাবি, আগামী নির্বাচনে দলটি নিজস্ব প্রতীকে অংশ নেবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে আগ্রহীদের দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পেছনে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন নাসীরুদ্দিন। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এবং তথ্য সংগ্রহ করে তারা দেখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পণ্যের দাম বেশি। তার দাবি, মেঘনা ও বসুন্ধরা গ্রুপের মতো বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাজারে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সমাবেশে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
ঢাকায় অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত থেকে হকার সরানোর উদ্যোগের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। তার মতে, জনস্বার্থে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিকল্প গণপরিবহন নিশ্চিত না করে অটোরিকশা বন্ধ করা হলে কর্মজীবী মানুষ বিপাকে পড়বেন। ব্যক্তিগত ও সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য দামি গাড়ি কেনার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
নাসীরুদ্দিন বলেন, রাজধানীতে আধুনিক ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের বড় শহরগুলোতে গণপরিবহনের যে গুরুত্ব রয়েছে, ঢাকাতেও তেমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত না করে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রাধান্য দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়েও সরকারকে সমালোচনা করেন এনসিপির এই নেতা। তার অভিযোগ, বিএনপি এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও গত আট মাসে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মহীন হয়েছেন। তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে এনসিপি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
সমাবেশে নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে নাসীরুদ্দিন বলেন, একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। ওসমান হাদির হত্যার পাশাপাশি ছাত্রশক্তির কর্মী আলিফের ওপর হামলার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। আলিফের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে তরুণদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শেষাংশে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আওয়ামী লীগের বিচার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, ঢাকায় উন্নত গণপরিবহন নিশ্চিত করা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এসব দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, শাহবাগের কর্মসূচি কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন শহর ও এলাকায় প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হবে। নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে তারা এগিয়ে যেতে চান বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন তিনি।




