মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার কর্ম, সৃষ্টি ও অবদান অনেক সময় বেঁচে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের মৃত্যুতে শোকাহত হয়েছিল পরিবার, সমাজ, দেশ কিংবা পুরো বিশ্ব। বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র ও ইতিহাসচর্চায় অসামান্য অবদান রাখা এমন কয়েকজন গুণী মানুষ ৫ নভেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আটজনের জীবন ও কর্ম নিয়ে আজকের আয়োজন।
জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (১৮৭৯-১৮৩১): আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম পথপ্রদর্শক ছিলেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে তিনি বিজ্ঞানের জগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। তার প্রণীত ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ তড়িৎচৌম্বক তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলেও বিজ্ঞানে রেখে যাওয়া অবদান আজও মৌলিক গবেষণার ভিত্তি।
ই এইচ কার (১৯৮২-১৮৯২): ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছিলেন ব্রিটিশ চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড হ্যালেট কার। ইতিহাসের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। What Is History? তার অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সোভিয়েত ইতিহাস নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। ৯০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
আর্ট টেটাম (১৯৫৬-১৯০৯): জ্যাজ সংগীতের ইতিহাসে অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আর্ট টেটাম। পিয়ানো বাজানোর অসাধারণ গতি, কারিগরি দক্ষতা ও স্বতন্ত্র সুরের কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সংগীতচর্চায় তার দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। বিংশ শতাব্দীর জ্যাজ পিয়ানো সংগীতের বিকাশে তার প্রভাব আজও স্মরণ করা হয়।
জান ওর্ট (১৯৯২-১৯০০): মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নাম জান হেনড্রিক ওর্ট। এই ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমাদের ছায়াপথের গঠন, ঘূর্ণন ও নক্ষত্রের গতিবিধি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলে ধূমকেতুর সম্ভাব্য উৎসস্থল হিসেবে পরিচিত ওর্ট ক্লাউডের ধারণা তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ৯২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ম্যাক সেনেট (১৯৬০-১৮৮০): নীরব চলচ্চিত্র যুগের হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ম্যাক সেনেট। তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা। তার নির্মিত কমেডি চলচ্চিত্রগুলোতে স্ল্যাপস্টিক হাস্যরস, দ্রুতগতির দৃশ্য ও ব্যতিক্রমী অভিনয়শৈলী বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায়। চার্লি চ্যাপলিনসহ অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর প্রাথমিক চলচ্চিত্রজীবনে তার প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জিল ক্লেইবার্গ (২০১০-১৯৪৪): মার্কিন চলচ্চিত্র ও মঞ্চের পরিচিত অভিনেত্রী ছিলেন জিল ক্লেইবার্গ। বাস্তবধর্মী চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতা তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। An Unmarried Woman চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার অর্জন করেন এবং অস্কারের মনোনয়নও পান। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে মঞ্চ ও পর্দায় নানা ধরনের চরিত্রে কাজ করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
জিওফ্রে পামার (২০২০-১৯২৭): ব্রিটিশ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় করে দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন জিওফ্রে পামার। বিশেষ করে হাস্যরসাত্মক টেলিভিশন সিরিজে তাঁর অভিনয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। As Time Goes By এবং The Fall and Rise of Reginald Perrin তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে। স্বতন্ত্র অভিনয়ভঙ্গি ও সংযত রসবোধের জন্য তিনি ব্রিটিশ বিনোদনজগতে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
অ্যারন কার্টার (২০২২-১৯৮৭): অল্প বয়সেই সংগীতজগতে পরিচিতি পাওয়া মার্কিন পপশিল্পী অ্যারন কার্টার কিশোর বয়সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার Aaron's Party (Come Get It) অ্যালবামটি তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। সংগীতের পাশাপাশি র্যাপ, অভিনয় ও নৃত্যেও যুক্ত ছিলেন তিনি। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তার আকস্মিক মৃত্যু সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে শোকের ছায়া ফেলে।
৫ নভেম্বরের এই প্রয়াণের তালিকায় থাকা ব্যক্তিত্বরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে রেখে গেছেন স্বতন্ত্র পরিচয়। কেউ বিজ্ঞানের জটিল রহস্য উন্মোচন করেছেন, কেউ ইতিহাস ও রাজনীতির বিশ্লেষণে নতুন দিগন্ত খুলেছেন, আবার কেউ সংগীত ও চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের শারীরিক অনুপস্থিতি ইতিহাসের একটি অধ্যায় হলেও তাদের কর্ম ও সৃষ্টিই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে মানুষের স্মৃতিতে। মৃত্যুর পরও যাদের অবদান সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকে, তারাই প্রকৃত অর্থে ইতিহাসের স্মরণীয় মানুষ।


