ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের পরিচয় কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের জীবন হয়ে ওঠে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, মানবিকতা ও আদর্শের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তার সাহসী ভূমিকা, অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে বাঙালির ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন আইনজীবী, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক এবং সর্বোপরি মানুষের বন্ধু।
বিক্রমপুরের শিকড়, কলকাতায় জন্ম
১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তার পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের তেলিরবাগ গ্রামে, যা বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার অন্তর্গত। তার বাবা ভুবনমোহন দাশ ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের একজন পরিচিত আইনজীবী এবং মা নিস্তারিণী দেবী।
শিক্ষাজীবনে মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন চিত্তরঞ্জন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। সেখানে আইন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করে ব্যারিস্টার হন। দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
আদালত থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনে
আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল দেশের স্বাধীনতা। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের বিস্তার ঘটে।
১৯০৮ সালের ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলায় অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে আইনি লড়াই তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। অসাধারণ যুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি আদালতে অরবিন্দের পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন। এই মামলা তার আইনজীবী জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত আইন পেশা ছেড়ে দেন। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের নিশ্চয়তা উপেক্ষা করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। তার এই আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর জায়গা করে নেয়। মানুষের ভালোবাসায় তিনি পরিচিত হন ‘দেশবন্ধু’ নামে।
স্বরাজ প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনৈতিক চিন্তায় ছিল বাস্তববাদ ও দূরদর্শিতার সমন্বয়। স্বাধীনতার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে তিনি শুধু রাজপথের প্রতিবাদের ওপর নির্ভর করেননি, সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকেও ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করার কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।
১৯২৩ সালে মতিলাল নেহরুর সঙ্গে তিনি স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার আইনসভায় প্রবেশ করে ঔপনিবেশিক সরকারের নীতির বিরোধিতা এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো করাই ছিল এই দলের অন্যতম লক্ষ্য। ১৯২৪ সালে কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। নগর প্রশাসনকে জনকল্যাণমুখী করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দেন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সমাজসংস্কারে অবদান
দেশবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বিভক্ত সমাজ নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন।
১৯২৩ সালে তার উদ্যোগে বাংলার হিন্দু ও মুসলিম নেতাদের মধ্যে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ সম্পাদিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা ছিল এর উদ্দেশ্য।
জাতীয় শিক্ষা, মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসার, নারীর অধিকার, বিধবা বিবাহ এবং জাতপাতের বৈষম্য দূর করার পক্ষেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। তার কাছে স্বাধীনতা মানে শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়, বরং মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিও।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও উজ্জ্বল উপস্থিতি
রাজনীতি ও আইন পেশার বাইরে চিত্তরঞ্জন দাশের আরেকটি পরিচয় ছিল সাহিত্যিক হিসেবে। কবিতা ও প্রবন্ধ রচনায় তার আগ্রহ ছিল গভীর। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘মালঞ্চ’, ‘সাগরসংগীত’ ও ‘অন্তর্যামী’।
সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের জীবন, সমাজ ও আত্মিক অনুভূতিকে তুলে ধরেছেন। তার ব্যক্তিত্বে রাজনীতির দৃঢ়তা এবং সাহিত্যের কোমল অনুভূতি একসঙ্গে বিকশিত হয়েছিল।
অকালপ্রয়াণ, কিন্তু আদর্শের মৃত্যু নেই
দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, কারাবরণ ও নিরলস পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন দেশবন্ধু। ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দার্জিলিংয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তার জীবনাবসান ঘটে।
তার মৃত্যুতে সমগ্র ভারতবর্ষে শোকের ছায়া নেমে আসে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছিলেন—
‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ,
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’
এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন দেশবন্ধুর জীবন ও আত্মত্যাগের চিরন্তন তাৎপর্য তুলে ধরেছিলেন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা ও প্রাপ্তির চেয়ে মানুষের কল্যাণ এবং দেশের স্বার্থ অনেক বড়। তিনি নিজের মেধা, অর্থ, সময় ও শ্রম উৎসর্গ করেছিলেন বৃহত্তর সমাজের জন্য। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রচেষ্টা, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে অবদান তাকে ইতিহাসে অনন্য করে রেখেছে।
আজকের সমাজেও তার আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। বিভেদ নয়, ঐক্য; ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনকল্যাণ; ক্ষমতার মোহ নয়, মানুষের অধিকার—এই মূল্যবোধগুলোই ছিল তার রাজনৈতিক ও মানবিক দর্শনের ভিত্তি। জন্মের দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাই কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন, তিনি বাঙালির দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও মানবিক চেতনার এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।



