ছোটবেলায় সার্কাস দেখতে গিয়ে হাতির কসরত, ভালুকের নাচ কিংবা প্রশিক্ষিত প্রাণীর নানা অঙ্গভঙ্গি দেখে আমরা হাততালি দিয়েছি। তখন বুঝিনি, মানুষের কয়েক মিনিটের আনন্দের পেছনে কোনো প্রাণীর ভয়, কষ্ট আর বন্দিজীবনের গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। প্রাণীর অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে গবেষণা, আইন এবং সচেতনতা সামনে এনেছে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রশ্ন—মানুষের বিনোদনের জন্য একটি প্রাণীকে তার স্বাভাবিক জীবন ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার অধিকার আমাদের আছে কি?
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘ফার্দিনান্দ’ (Ferdinand) এই প্রশ্নটি ভাবতে শেখায়। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি বিশাল ষাঁড়। শক্তিশালী হলেও সে শান্তিপ্রিয়; লড়াই নয়, ফুলের ঘ্রাণ আর নিরিবিলি পরিবেশ তার পছন্দ। কিন্তু তার চেহারা ও শক্তির কারণে তাকে ষাঁড়ের লড়াইয়ের জগতে ঠেলে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত গল্পটি মনে করিয়ে দেয়, কোনো প্রাণীকে শুধু তার বাহ্যিক গঠন বা শক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না; তারও অনুভূতি ও নিজস্ব স্বভাব রয়েছে।
ফার্দিনান্দের গল্প শুধু একটি ষাঁড়ের নয়
ষাঁড়ের লড়াই কিংবা প্রাণী দিয়ে কসরত দেখানোর মতো আয়োজন মানুষের কাছে রোমাঞ্চকর মনে হতে পারে। কিন্তু দর্শকের করতালির বিপরীতে প্রাণীটির অভিজ্ঞতা হতে পারে ভয়, আঘাত, মানসিক চাপ, এমনকি মৃত্যুঝুঁকি। বিনোদনের মঞ্চে প্রাণীকে অনেক সময় জীবন্ত সত্তা হিসেবে নয়, প্রদর্শনের উপকরণ হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ প্রতিরোধের বিধান রয়েছে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রহার, অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো, খাবার-পানির অভাব সৃষ্টি, কষ্টদায়কভাবে আটকে রাখা এবং প্রাণীকে লড়াইয়ে প্ররোচিত করার মতো আচরণ আইনের আলোচনায় এসেছে। আইনটির ১২ ধারায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রাণীকে দৈহিক কসরত শেখানো কিংবা বিনোদন, খেলা ও প্রদর্শনের কাজে ব্যবহারের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রাণী দিয়ে খেলা দেখানো শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাণীর কল্যাণ এবং আইনি দায়িত্ব।
সার্কাসের স্মৃতি, বাস্তবের কষ্ট
একসময় সার্কাস মানেই ছিল হাতির কসরত, ভালুকের নাচ কিংবা নানা প্রাণীর অস্বাভাবিক আচরণ প্রদর্শন। দর্শক এসবকে প্রশিক্ষণের সাফল্য হিসেবে দেখতেন। কিন্তু প্রাণী কল্যাণের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও জটিল।
হাতির স্বাভাবিক জীবন হলো চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, সামাজিক দলের সঙ্গে থাকা এবং নিজের পরিবেশে নানা আচরণ প্রকাশ করা। অথচ বিনোদনের জন্য বন্দি হাতিকে দীর্ঘ সময় শিকলে আটকে রাখা, নির্দিষ্ট নির্দেশে কাজ করানো কিংবা দর্শকের সামনে বারবার একই কসরত করতে বাধ্য করা তার স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ সীমিত করতে পারে।
World Animal Protection-এর ২০২৬ সালের গবেষণায় থাইল্যান্ডের ২৩৬টি পর্যটনকেন্দ্রে থাকা ২ হাজার ৮৪৯টি হাতির অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ৬৯ শতাংশ হাতির পরিবেশকে দরিদ্র বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্য দেওয়া হয়েছে। স্বল্প দৈর্ঘ্যের শিকলে বেঁধে রাখা, অপর্যাপ্ত খাবার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পশুচিকিৎসার ঘাটতি এবং পর্যটকদের সঙ্গে বাধ্যতামূলক মিথস্ক্রিয়ার মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণপদ্ধতি নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। হাতির বাচ্চাকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, বেঁধে রাখা কিংবা ভয় দেখিয়ে নির্দেশ মানতে বাধ্য করার মতো পদ্ধতি প্রাণীর শারীরিক ও মানসিক কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
প্রাণীটি কি সত্যিই আনন্দিত?
কোনো প্রাণীকে মানুষের সামনে কসরত করতে দেখে আমাদের মজার মনে হতে পারে। কিন্তু সে কেন এমন আচরণ করছে, তা বোঝা জরুরি। প্রাণীটি কি স্বাভাবিকভাবে কাজটি করছে, নাকি ভয়, শাস্তি ও দীর্ঘ প্রশিক্ষণের চাপে বাধ্য হচ্ছে?
বন্দিত্ব ও মানসিক চাপের প্রভাব কখনো কখনো প্রাণীর অস্বাভাবিক পুনরাবৃত্ত আচরণে প্রকাশ পেতে পারে। একইভাবে বারবার দুলতে থাকা কিংবা পা নাড়ানোর মতো আচরণ কিছু ক্ষেত্রে চাপের লক্ষণ হতে পারে। তবে শুধু একটি আচরণ দেখেই প্রাণীর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়; পরিবেশ ও অন্যান্য লক্ষণও বিবেচনায় নিতে হয়।
সমস্যাটি শুধু সার্কাসের হাতি বা ভালুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ষাঁড়ের লড়াই, বন্যপ্রাণীর প্রদর্শনী, হাতির পিঠে চড়া, বন্যপ্রাণীর সঙ্গে জোর করে ছবি তোলা কিংবা পর্যটকদের জন্য প্রাণীকে স্পর্শ ও গোসল করানোর আয়োজনেও কল্যাণের প্রশ্ন রয়েছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেকে ‘রেসকিউ’, ‘স্যানচুয়ারি’ বা ‘এথিক্যাল’ বলে পরিচয় দিলেই সেটি প্রাণীবান্ধব হয়ে যায় না। প্রাণীটি কোথায় ও কীভাবে রাখা হচ্ছে, তার চলাফেরা ও সামাজিক আচরণের সুযোগ আছে কি না, শিকল বা শাস্তি ব্যবহার করা হয় কি না এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে কি না—এসবই গুরুত্বপূর্ণ।
আইন আছে, দরকার সচেতনতা
বাংলাদেশে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো। বন্যপ্রাণীর সুরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো আইনের সর্বশেষ সংশোধন, কার্যকারিতা ও নির্দিষ্ট ধারার প্রয়োগ নিয়ে লেখার আগে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও মূল আইন যাচাই করা জরুরি।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন জনসচেতনতা। কোনো প্রদর্শনীতে প্রাণী থাকলে দর্শকের প্রশ্ন করা উচিত—প্রাণীটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা পাচ্ছে কি না এবং তার স্বাভাবিক আচরণের সুযোগ রয়েছে কি না। শিশুদেরও শেখাতে হবে, প্রাণীকে ভালোবাসা মানে শুধু আদর করা নয়। তার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, স্বাভাবিক আচরণ এবং কষ্ট থেকে সুরক্ষিত থাকার বিষয়টিও সম্মান করা।
আনন্দ হোক, কারও কষ্টের বিনিময়ে নয়
‘ফার্দিনান্দ’ শুধু শিশুদের জন্য তৈরি একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নয়; এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। শক্তিশালী প্রাণীও ভয় পেতে পারে, প্রদর্শনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত প্রাণীরও অনুভূতি আছে, আর মানুষের সামনে বাধ্য হয়ে কসরত করা মানেই আনন্দিত হওয়া নয়।
ছোটবেলায় সার্কাস দেখে হাততালি দেওয়ার স্মৃতিকে অপরাধবোধ দিয়ে মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং সেই স্মৃতি থেকে নতুন শিক্ষা নেওয়া যায়। তখন হয়তো আমরা জানতাম না; এখন জানার সুযোগ আছে। তাই বিনোদনের ধারণাও বদলানো দরকার। এমন আনন্দই কাম্য, যেখানে মানুষ আনন্দ পাবে, কিন্তু কোনো প্রাণীকে তার জন্য ভয়, যন্ত্রণা কিংবা বন্দিত্বের মূল্য দিতে হবে না। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সহজ—মানুষের কয়েক মিনিটের আনন্দ কি একটি প্রাণীর দীর্ঘদিনের কষ্টের চেয়ে বেশি মূল্যবান?