আইন কেবল কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি নয়, তার কার্যকর প্রয়োগই পারে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।** বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ থাকলেও বাল্যবিবাহের উচ্চ হার উদ্বেগজনক। আইনের কিছু অস্পষ্টতা, বিশেষ বিধানের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন এবং দুর্বল নজরদারি এ সমস্যা মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলছে। তাই শিশুদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় আইনটির সংশোধন এখন সময়ের দাবি।
উদ্বেগজনক চিত্র
ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনএফপিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বাল্যবিবাহ কমার বার্ষিক হার মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ। এ গতিতে অগ্রগতি হলে বাল্যবিবাহ নির্মূলে দীর্ঘ সময় লাগবে, যা ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাল্যবিবাহের প্রভাব শুধু অল্প বয়সে সংসার শুরু করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
আইনের ফাঁক ও জটিলতা
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং মেয়েদের ১৮ বছর। আইনটিতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি গঠন, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নিবন্ধকের শাস্তির বিধান রয়েছে।
তবে আইনের ১৯ ধারার ‘বিশেষ বিধান’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন রয়েছে। এ ধারায় বিশেষ প্রেক্ষাপটে, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায়, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা অভিভাবকের সম্মতিতে বিয়ে হলে তা আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য না হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ প্রেক্ষাপট ও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নির্ধারণে সুস্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে এ বিধানের অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশেষ করে সামাজিক চাপ, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ কিংবা যৌন সহিংসতার ঘটনায় শিশুকে বিয়েতে বাধ্য করার ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুর নিজস্ব মতামত, স্বাধীন সম্মতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনে বাল্যবিবাহের শিকার অপ্রাপ্তবয়স্ক পক্ষকে ভুক্তভোগী হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি কিছু পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিশুদের শাস্তির আওতায় না এনে তাদের শিক্ষা, পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বয়সের বৈষম্য ও প্রয়োগের দুর্বলতা
ছেলে ও মেয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়সে পার্থক্যের কারণে কিছু পরিস্থিতিতে আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ বন্ধে আদালতের এখতিয়ার, বিশেষ বিধানের আবেদন নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনের দায়িত্ব বণ্টন আরও স্পষ্ট করা দরকার।
আইনের অধীনে মুচলেকা দিয়ে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শর্ত মানছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অন্যদিকে, জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাইয়ে দুর্বলতা থাকলে বাল্যবিবাহ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষার ক্ষেত্রেও আইনগত সামঞ্জস্য প্রয়োজন। দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় বিবাহসংক্রান্ত যে ব্যতিক্রম রয়েছে, তা শিশুর সুরক্ষা ও যৌন সহিংসতার বিচার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এ বিষয়ে আইন সংস্কার করে বিয়েকে কোনোভাবেই শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা আড়াল করার উপায় হতে না দেওয়ার দাবি রয়েছে।
আইন সংশোধনের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ
বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, মেয়েদের শিক্ষায় বাধা, সামাজিক কুসংস্কার, যৌতুক এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের মতো কারণ কাজ করে। ফলে শুধু আইন কঠোর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা, কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
আইনের ‘বিশেষ বিধান’ স্পষ্ট বা বাতিল করা, ছেলে-মেয়ের বিয়ের বয়সের বৈষম্য দূর করা, শিশুর মতামত ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আদালত ও প্রশাসনের এখতিয়ার নির্দিষ্ট করার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিবাহ নিবন্ধনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বয়স যাচাই এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
বাল্যবিবাহ একটি শিশুর শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। তাই আইনকে কার্যকর করতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট বিধান, জবাবদিহি, সামাজিক সচেতনতা এবং শিশুর অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। আইন কাগজে থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই বাল্যবিবাহমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার প্রধান শর্ত।