উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কোনো দুর্বলতা বা চরিত্রের ত্রুটি নয়। এগুলো সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যার কার্যকর চিকিৎসা ও সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ৪৭ কোটি মানুষ উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে ভুগছিলেন। তবু সামাজিক সংকোচ, ভয় এবং সচেতনতার অভাবে অনেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে পারেন না।
মানসিক স্বাস্থ্য মানে শুধু মানসিক অসুস্থতা না থাকা নয়। জীবনের চাপ সামলানো, নিজের সক্ষমতা কাজে লাগানো, কাজ ও পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতাও এর অংশ। দুঃখ, রাগ, দুশ্চিন্তা কিংবা ক্লান্তি মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু এসব অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
উদ্বেগের লক্ষণ চিনুন
উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভয়, অস্থিরতা কিংবা ভবিষ্যতে খারাপ কিছু ঘটবে—এমন আশঙ্কা অতিরিক্ত হয়ে উঠতে পারে। বুক ধড়ফড়, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘাম, শ্বাসকষ্ট, পেশিতে টান, ঘুমের সমস্যা এবং মনোযোগের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে। পরীক্ষা, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিস্থিতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিষণ্নতা শুধু মন খারাপ নয়
বিষণ্নতার ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় ধরে দুঃখ, শূন্যতা বা হতাশা অনুভূত হতে পারে। আগে যে কাজে আনন্দ পাওয়া যেত, তাতেও আগ্রহ কমে যায়। ঘুম ও ক্ষুধার পরিবর্তন, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা এবং নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় মৃত্যু বা আত্মহত্যার চিন্তাও আসতে পারে।
উদ্বেগ ও বিষণ্নতা যেকোনো বয়স, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের মানুষের হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সহিংসতা, সম্পর্কের ভাঙন, নির্যাতন, একাকিত্ব, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা এবং পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে চিকিৎসা পাওয়ার বাধা
বাংলাদেশের প্রজননবয়সী নারীদের নিয়ে একটি গবেষণায় প্রায় ২০ শতাংশের উদ্বেগ এবং প্রায় ৫ শতাংশের বিষণ্নতার কথা উঠে এসেছে। একই গবেষণায় মাত্র ৭.৬ শতাংশ নারী উদ্বেগ বা বিষণ্নতার রোগনির্ণয় পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং ২.০৩ শতাংশ চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে ওষুধ কিংবা চিকিৎসা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। এই পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট গবেষণার ফল; এগুলোকে দেশের সব নারীর বর্তমান চিত্র হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, চিকিৎসা সম্পর্কে তথ্যের অভাব, ব্যয় এবং সেবাকেন্দ্রে পৌঁছানোর অসুবিধা সহায়তা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যত্ন
উদ্বেগ ও বিষণ্নতার চিকিৎসায় কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এক্সপোজার থেরাপি, শিথিলায়ন ও মাইন্ডফুলনেসের মতো পদ্ধতিও সহায়ক হতে পারে। কোন চিকিৎসা উপযুক্ত হবে, তা ব্যক্তির উপসর্গ ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নির্ধারণ করতে হয়।
চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সময়মতো খাবার, ধীর শ্বাসের অনুশীলন এবং দৈনন্দিন কাজের রুটিন বজায় রাখা উপকারী হতে পারে। বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কমানো এবং মাদক এড়িয়ে চলাও সহায়ক। তবে এসব অভ্যাস পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়।
দীর্ঘদিনের তীব্র হতাশা, নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা, আত্মহত্যার চিন্তা কিংবা দৈনন্দিন কাজ চালাতে অক্ষমতা দেখা দিলে দ্রুত সাহায্য নিতে হবে। তাৎক্ষণিক ঝুঁকি থাকলে একা না থেকে বিশ্বস্ত কাউকে সঙ্গে রাখুন এবং নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। বাংলাদেশে জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যায়।
সহমর্মিতা হোক প্রথম পদক্ষেপ
মানসিক কষ্টে থাকা কাউকে শুধু ‘সাহস করো’ বা ‘এত চিন্তা করো না’ বললে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং তার কথা মন দিয়ে শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা দরকার।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়। এটি যত্ন, সহানুভূতি ও চিকিৎসার বিষয়। সহায়তা চাওয়া দুর্বলতা নয়; বরং নিজের সুস্থতার দায়িত্ব নেওয়ার সাহসী পদক্ষেপ। এমন সমাজ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে কেউ মানসিক কষ্টে একা বোধ করবে না এবং প্রয়োজনের সময় সহজেই সহায়তা পাবে।