শিশুদের হাম প্রতিরোধে কার্যকর টিকা ও দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বাদ পড়া শিশু, বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং মাঠপর্যায়ে সেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন মূল্যায়ন দলের পর্যবেক্ষণেও শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। মূল্যায়ন দলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৯ শিশু হামের টিকা পায়নি। তাদের পর্যবেক্ষণে ২০২৫ সালে হাম-রুবেলার টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
টিকার বাইরে রয়ে গেছে বহু শিশু
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। সংক্রমণ ঠেকাতে নির্ধারিত সময়ে টিকার প্রয়োজনীয় ডোজ নিশ্চিত করা জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার সন্তোষজনক হলেও নির্দিষ্ট এলাকা বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু বাদ পড়লে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যায়।
এ ক্ষেত্রে শুধু কত শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, তা জানাই যথেষ্ট নয়। কোন এলাকায় কত শিশু টিকা পায়নি, প্রথম ডোজ নেওয়ার পর কারা দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে এবং তাদের কীভাবে টিকার আওতায় আনা হবে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণও খতিয়ে দেখা জরুরি। পরিকল্পনা, টিকা সংগ্রহ, মজুত ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহের কোন পর্যায়ে ঘাটতি ছিল, তা নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকটের ঝুঁকি থেকে যাবে।
রোগ শনাক্তকরণে তথ্যের সামঞ্জস্য জরুরি
হামের প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তকরণ ও পরিসংখ্যানের পার্থক্যও আলোচনায় এসেছে। স্বাধীন মূল্যায়ন দলের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে পরীক্ষার ভিত্তিতে হাম শনাক্তের হার ছিল ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে এ হার ১১ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুটি হিসাবের মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণ স্পষ্ট করা প্রয়োজন। রোগী নির্বাচনের পদ্ধতি, পরীক্ষার আওতা, নমুনা সংগ্রহ কিংবা রোগ শনাক্তের প্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকলে ফলাফলেও ব্যবধান তৈরি হতে পারে। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও টিকাদান পরিকল্পনা করা কঠিন।
মাঠপর্যায়ে ঘাটতি পূরণের তাগিদ
টিকা সংগ্রহ করলেই কর্মসূচি সফল হয় না। নির্ধারিত সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা পৌঁছানো, সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, প্রশিক্ষিত কর্মীর উপস্থিতি এবং অভিভাবকদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশে স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান পরিকল্পনার ঘাটতি সংশোধন, শূন্য পদ পূরণ এবং টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চল ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর শিশুদের টিকার আওতায় আনতে নিবিড় তদারকি প্রয়োজন।
হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে শুধু অভিভাবকদের অসচেতনতা বা টিকা নিতে অনীহাকে দায়ী করলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। কোনো শিশু টিকা না পেলে কেন পায়নি, সংশ্লিষ্ট পরিবারকে জানানো হয়েছিল কি না, কেন্দ্রে টিকা ছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
হাম নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত টিকার মজুত নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সচল রাখা জরুরি। নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং সংক্রমণের বিস্তার পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে অতীতের ঘাটতি চিহ্নিত করে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, প্রতিরোধযোগ্য রোগের টিকা থাকা সত্ত্বেও শিশুরা সুরক্ষার বাইরে থেকে গেলে তা শুধু চিকিৎসার সমস্যা নয়; টিকাদান ব্যবস্থার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।




