শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচিত হলেও নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পড়েছেন দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নেতারা। শিক্ষার্থীকে মারধর, শিক্ষকদের হেনস্তা, প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ এবং বিভাজন সৃষ্টির অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে তাদের ভূমিকা নিয়ে।
সর্বশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতাদের গরু জবাই করে ‘গরুভোজ’ আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুর্গাপূজার সময় ক্যাম্পাসের মন্দিরের কাছে ভোজের আয়োজন নিয়ে হিন্দু শিক্ষার্থীদের আপত্তির পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পশু জবাইয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর প্রতিবাদে নতুন করে এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মুশতাক হুসাইন বলেন, ছাত্র সংসদের মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া ছাত্র আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাবেক সহসভাপতি রাগিব আহসান মুন্নার মতে, ছাত্র সংসদগুলো মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফিরে আসা ইতিবাচক হলেও আবাসন, খাবার ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি।
দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছর প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচটি ছাত্র সংসদই ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্ক
ডাকসুর নেতাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতিকৃতি স্থাপন এবং প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’ চালুর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের অনলাইন মূল্যায়নব্যবস্থা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তাদের আশঙ্কা, এ ব্যবস্থা সাইবার হয়রানির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, গত ২৭ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় রাকসুর নেতারা সমালোচিত হন। ভিডিওতে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারকে শিক্ষার্থীদের মারধর করতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আম্মারের দাবি, ওই শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর হামলা করেছিলেন এবং তারা প্রতিরোধ করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকসুর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এক শিক্ষককে ধাওয়া করে প্রক্টরের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে রেজিস্ট্রার ভবনে তালা দেওয়ার ঘটনায় জাকসুর নেতারা সমালোচনার মুখে পড়েন।
এ ছাড়া ডাকসুর এক নির্বাহী সদস্যের বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিককে মারধর, এক যুগলকে হেনস্তা এবং কিশোর-তরুণদের জোর করে কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।
জবাবদিহি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
ছাত্র সংসদগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাকসুর কয়েকটি কর্মসূচির ব্যয়ের ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি। ডাকসুর ঘোষিত প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দের হিসাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক ও ছাত্র সংসদের সাবেক নেতাদের মতে, আবাসনসংকট, খাবারের মান, যাতায়াত, চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা এবং শিক্ষার পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ছাত্র সংসদগুলোর আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, মতপার্থক্য থাকলেও তা মোকাবিলা করতে হবে গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে। শিক্ষকদের হেনস্তা কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা না করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংসদগুলোর কার্যক্রমের মূল্যায়ন হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, কল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়নে তাদের অবদানের ভিত্তিতে।



