ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পাঠ্যবইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের পর বই সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো বই ফিরিয়ে এনে ছবিটি পরিবর্তন করে পুনরায় ছাপানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ১৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ছাপানো ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের নকশায় দাঁড়িপাল্লার ছবি থাকায় প্রশ্ন ওঠে। কারণ, দাঁড়িপাল্লা একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।
বিতর্কের পর ছবিটি সরিয়ে তার জায়গায় মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনসিটিবির সূত্র অনুযায়ী, বই ছাপার কাজ অনেকটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ২০ লাখ বই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পাঠানোও হয়েছিল। ফলে সংশোধনের জন্য বই ফেরত আনা, নতুন করে ছাপানো ও পুনরায় সরবরাহ করার প্রক্রিয়ায় বাড়তি সময় ও অর্থ লাগবে। আইসিটি বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি ধাপ তুলে ধরা হয়েছে—উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।
পিরামিডের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে আলাদা প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বোচ্চ স্তর ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি রাখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের বইয়ে থাকা ছবিটি ২০২৬ সালের সংস্করণে পরিবর্তন করে মস্তিষ্কের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৭ সালের বইয়ের নকশায় আগের ছবিটি আবার যুক্ত হয়ে যায়। বিষয়টি সামনে আসার পর মুদ্রণ বন্ধ এবং ইতিমধ্যে পাঠানো বই ফেরত আনার সিদ্ধান্ত হয়। এনসিটিবির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বইগুলো জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে সংগ্রহ করে সংশোধনের পর আবার পাঠানোর বিষয়ে অনলাইন সভা হয়েছে।
সংশোধিত বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইও রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বই ছাপানোর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শনসহ বিভিন্ন ধাপ শেষে মোট বইয়ের ৭৬ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় অর্ধেক ছাপানো শেষ হয়েছে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। এই অবস্থায় আইসিটি বই ফেরত এনে সংশোধনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ, একদিকে বইয়ের নকশা সংশোধন করতে হবে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে চারটি নতুন বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।
এনসিটিবির এক কর্মকর্তা জানান, এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির সভা ডাকা হয়েছে। সভায় অনুমোদন পেলে নতুন বই ছাপানোর কার্যাদেশ দেওয়া হতে পারে। পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি প্রতীকের মতো দেখতে কোনো চিহ্ন ব্যবহারের ঘটনায় বই প্রণয়নের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এনসিটিবির দাবি, আগের নকশা ভুলক্রমে আবার যুক্ত হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, কীভাবে এমন ভুল ঘটেছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের শেখার প্রধান মাধ্যম হওয়ায় এর বিষয়বস্তু ও চিত্র নির্বাচন সতর্কতার সঙ্গে করা জরুরি। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীকের সঙ্গে মিলে যায়—এমন ছবি থাকলে তা অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক তৈরি করতে পারে। তাই সংশোধনের পাশাপাশি নকশা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।




