একদিকে স্মার্টফোনের পর্দায় মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে অসংখ্য তথ্য, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য। দ্রুত ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়লেও সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মিত অনুশীলন ও ধৈর্যের গুরুত্ব কমেনি। এই বাস্তবতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে মেধার পাশাপাশি প্রয়োজন পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়।
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বীরসিংহ গ্রামে জন্ম নেওয়া ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তার পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল না। তবু সীমিত সুযোগের মধ্যেই তিনি শিক্ষার পথ ধরে এগিয়ে যান। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে কলকাতায় পড়াশোনা করেন এবং ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলংকার, বেদান্ত, ন্যায়, স্মৃতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার দক্ষতা গড়ে ওঠে। ১৮৩৯ সালে তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পান, যার অর্থ জ্ঞানের সাগর।
শিক্ষাজীবনের সাফল্য তাকে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা দেয়নি; সমাজের জন্য কাজ করার পথও তৈরি করেছে। ১৮৪১ সালে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। বাংলা ভাষা ও গদ্যচর্চায় অবদান রাখার পাশাপাশি নারীশিক্ষার প্রসার এবং বিধবাবিবাহের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার প্রচেষ্টায় বিধবাবিবাহের পক্ষে জনমত গড়ে ওঠে এবং ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবাবিবাহ আইন প্রণীত হয়। শিক্ষা যে কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়, সমাজ পরিবর্তনেরও শক্তি—বিদ্যাসাগরের জীবন তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বিদ্যাসাগরকে নিয়ে প্রচলিত গল্পের মধ্যে রয়েছে পড়ার সময় ঘুম এড়াতে টিকি দড়িতে বেঁধে রাখা কিংবা চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কাহিনি। এসব গল্প অধ্যবসায়ের প্রতীক হিসেবে বলা হলেও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা ঠিক নয়। তার শিক্ষাজীবনের নথিভুক্ত অর্জন, কঠিন পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী কর্মজীবনের অবদানই তার নিষ্ঠার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
আজকের শিক্ষার্থীদের সামনে চ্যালেঞ্জের ধরন বদলেছে, কিন্তু মূল প্রশ্ন একই—সময় কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে? মোবাইলে পড়াশোনার উপকরণ পাওয়া যায়, অনলাইন ক্লাস করা যায়, কঠিন বিষয় সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়। একই যন্ত্র আবার মনোযোগ নষ্ট করতে পারে, যদি পড়ার মাঝখানে বারবার বার্তা, ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় চলে যায়। তাই প্রযুক্তি বর্জন নয়, প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই জরুরি।
শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি অভ্যাস বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। প্রতিদিনের পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট সময় ফোন নীরব রাখা, কঠিন বিষয় ছোট অংশে ভাগ করে শেখা, পড়ার পর নিজেকে প্রশ্ন করা এবং নিয়মিত পুনরাবৃত্তি করা—এসব অভ্যাস শেখাকে আরও ফলপ্রসূ করে। পর্যাপ্ত ঘুমও জরুরি; কারণ ক্লান্ত শরীর ও মন দিয়ে দীর্ঘ সময় পড়লেও শেখা বিষয় মনে রাখা কঠিন হতে পারে। শৃঙ্খলা মানে নিজেকে অযথা কষ্ট দেওয়া নয়, বরং নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী সময় ও শক্তি ব্যবহার করা।
সবাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হবেন না, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। কেউ হয়তো বিদ্যাসাগরের মতো পাণ্ডিত্য অর্জন করবেন না, কিন্তু নিয়মিত পড়াশোনা করে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে পারবেন। ‘বিদ্যাসাগর’ না হোক, ‘বিদ্যাপুকুর’ হওয়ার লক্ষ্যও যদি থাকে, তবু বই খুলতে হবে, বুঝে পড়তে হবে এবং নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে।
কারণ সাফল্যের কোনো জাদুকরি পথ নেই। মেধা সম্ভাবনা তৈরি করে, আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয় অধ্যবসায়। মোবাইলের পর্দায় সময় হারিয়ে নয়, সময়কে কাজে লাগিয়ে শেখার অভ্যাস গড়ে তুললেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারবে।




