হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু হলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে দ্রুত স্বস্তি ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জাহাজ চলাচলের ব্যয়, বিমা খরচ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তেল পরিবহন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে পেট্রল ও ডিজেলের দামে। সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম ৪ দশমিক ৩৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা বছরের এই সময়ের জন্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি। ডিজেলের দামও আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি এখনো কাটেনি।
জাহাজের বিমা প্রিমিয়াম, নাবিকদের ঝুঁকিভাতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তেল পরিবহনের খরচও বাড়ছে। জাহাজ চলাচলবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ক্লার্কসনের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ব্যবহৃত অতি বড় তেলবাহী জাহাজের দৈনিক ভাড়া গত বছর প্রায় ৬৫ হাজার ডলার ছিল। যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে তা বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে এ ব্যয় দৈনিক প্রায় ১৬ লাখ ডলারে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষক টম ক্লোজার মতে, জাহাজ চলাচলের ব্যয় এত বেশি হওয়া অস্বাভাবিক। তবে জাহাজের বড় ধরনের ক্ষতি না হলে এ পরিস্থিতিতে মালিকদের জন্য বিপুল মুনাফার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক বাণিজ্যসংক্রান্ত একটি সংস্থা বাণিজ্যিক জাহাজে একাধিক হামলার কথা জানিয়েছে।
এর মধ্যে অন্তত দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার আক্রান্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাবিকদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অংশ নিতে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া-আসার একটি যাত্রায় মোট ব্যয় ৩ থেকে ৪ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টম ক্লোজারের হিসাব অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের ব্যয় যুদ্ধের আগে প্রায় ২ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে তেলের চূড়ান্ত দাম বাড়ার চাপ তৈরি হচ্ছে। বাজারে তেলের দামের ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল ডেটেড ব্রেন্টের স্পট মূল্য ১৩৫ দশমিক ৭৪ ডলারে পৌঁছেছিল। একই সময়ে ব্রেন্ট ফিউচারসের দাম ছিল প্রায় ১০০ ডলার। সরবরাহ ও পরিবহন পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এ ব্যবধানের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুতিদের হামলার আশঙ্কা, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং রাশিয়ার সীমিত রপ্তানি সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। চীনের কিছু রপ্তানি সীমাবদ্ধতাও বাজারে প্রভাব ফেলছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলো প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিও উৎপাদন ও সরবরাহে চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি মজুত কমে আসায় বাজারের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এ পদক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালানির দাম দ্রুত কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবহন ব্যয়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, তেল শোধনাগারের কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক সরবরাহ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ভোক্তাদের বাড়তি দামের চাপ সহ্য করতে হতে পারে।




