বুয়েট থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে অনেকেই স্বপ্ন দেখেন বড় প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনের চাকরির। কিন্তু নাইলা সারাফ লিজা বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ। প্রকৌশলী ও ব্যাংকার হিসেবে কাজ করার পর এখন তিনি নেত্রকোনার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো আর তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আনন্দ।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা লিজার শিক্ষাজীবন কেটেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। পরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ২০০৯ সালের দিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ২০১১-১২ সালের দিকে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। কিন্তু প্রকৌশলী কিংবা ব্যাংকারের পেশায় নিজের মনের পরিপূর্ণতা খুঁজে পাননি।
২০১৭ সালে যোগ দেন নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শুরুতে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া নিয়ে সংশয় থাকলেও সহকর্মীদের আন্তরিকতা ও শিশুদের ভালোবাসা তাকে এই পেশায় স্থায়ী হতে অনুপ্রাণিত করে। এরপর কেটে গেছে প্রায় আট বছর।
লিজার কাছে শিক্ষকতা মানে শুধু বইয়ের পাঠ শেষ করা নয়; বরং শিশুদের বুঝতে শেখা, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং নিজের আগ্রহ থেকে শেখার পরিবেশ তৈরি করা। তিনি মনে করেন, শিক্ষকতার ক্ষেত্রে বড় ডিগ্রির পাশাপাশি শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝা ও সঠিক শিক্ষাদান পদ্ধতি জানা জরুরি।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশেন তিনি। টিফিনের সময় শিশুদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেন। তার বিশ্বাস, শিক্ষককে ভয় পেলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভুল বা সমস্যার কথা সহজে বলতে পারে না। তাই তিনি এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে চান, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে কথা বলতে ও শিখতে পারে।
সাহিত্য, ছবি আঁকা, নাচ, গান ও আবৃত্তির প্রতিও রয়েছে তার আগ্রহ। এসব সাংস্কৃতিক চর্চা শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করে বলে মনে করেন তিনি। তাই পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশে উৎসাহ দেন।
ঢাকার নাগরিক জীবন ছেড়ে এখন স্বামী ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে নেত্রকোনায় বসবাস করছেন লিজা। তার ছেলেও পড়ছে একই বিদ্যালয়ে। মফস্বলের মানুষের পারস্পরিক আন্তরিকতা ও সামাজিক বন্ধন তাকে আপন করে নিয়েছে।
উচ্চ বেতনের চাকরি কিংবা বড় পদ নয়, শিশুদের মানুষ করে তোলার মধ্যেই নিজের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন বুয়েটের এই সাবেক শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে থাকা পর্যন্ত শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি।