রাশিয়ার বৃহত্তম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইয়ানডেক্সের তিনটি তথ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় দেশটির বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় বিঘ্ন ঘটেছে। অনলাইন অনুসন্ধান, মানচিত্র, ট্যাক্সি, খাবার সরবরাহ ও ডিজিটাল লেনদেনের মতো সেবা ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। রাশিয়ার পাশাপাশি কাজাখস্তান ও বেলারুশেও ইয়ানডেক্সের কিছু সেবায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ডিজিটাল অবকাঠামোর গুরুত্ব সামনে এসেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ অক্টোবর থেকে চালানো হামলায় ইয়ানডেক্সের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত পাঁচটি প্রধান তথ্যকেন্দ্রের তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে।
ইয়ানডেক্স রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। অনলাইন অনুসন্ধান, মানচিত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থ লেনদেন, যাত্রী পরিবহন ও খাবার সরবরাহসহ নানা সেবা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। একাধিক ডিজিটাল সেবা একই প্ল্যাটফর্মে থাকায় একে রাশিয়ার গুগল, উবার ও অ্যামাজনের সমন্বিত সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
সেন্ট পিটার্সবার্গের ৩১ বছর বয়সী ইতিহাসের শিক্ষক আন্তন সিএনএনকে জানান, এক রাতে বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন, ইয়ানডেক্সের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট বাতিগুলো জ্বলছে না। অন্ধকার ঘরে বসে বাতি জ্বালাতে না পারার অভিজ্ঞতাকে তিনি অদ্ভুত বলে বর্ণনা করেন।
প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রায় এমন বিঘ্নের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে অনলাইনভিত্তিক পরিবহনসেবায়। মস্কোর ৩৩ বছর বয়সী এক ট্যাক্সিচালক জানান, ১১ অক্টোবর ভ্লাদিমির অঞ্চলে ইয়ানডেক্সের একটি তথ্যকেন্দ্রে হামলার পর চালকদের ব্যবহৃত ইয়ানডেক্স প্রো অ্যাপে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রার অনুরোধ আসছিল না। আবার কখনো একই যাত্রার জন্য একাধিক গাড়ি পাঠানো হচ্ছিল। চালকেরা গন্তব্যে পৌঁছে জানতে পারতেন, যাত্রী অন্য গাড়িতে চলে গেছেন।
সমস্যার কারণে উপার্জনের অর্থ তুলতে না পেরে ওই চালক গাড়িভাড়া ও জ্বালানির খরচ মেটাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তাকে ভাড়ার গাড়িটি ফেরত দিতে হয়। তার ভাষ্য, এ পরিস্থিতি অনেক চালকের জীবিকা ও পরিবারকে সহায়তা করার সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ডিজিটাল লেনদেনেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মস্কোর বাসিন্দা তাতিয়ানা জানান, ইয়ানডেক্স পেতে রাখা তার ১৫ লাখ রুবল, যা প্রায় ১৭ হাজার ৮৩০ মার্কিন ডলারের সমান, এক সকালে হিসাবে দেখা যাচ্ছিল না। গাড়ি কেনার জন্য অর্থ জমাচ্ছিলেন তিনি। তবে ইয়ানডেক্স জানিয়েছে, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সেবাগুলো পুনরায় চালুর কাজ চলছে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে নিজস্ব ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে মস্কো। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের রাশিয়া ছাড়ার প্রেক্ষাপটে ইয়ানডেক্সের মতো প্রতিষ্ঠান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে একাধিক সেবা একসঙ্গে বিপর্যস্ত হতে পারে।
ইউক্রেনের অবস্থান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশটির তথ্যকেন্দ্রগুলোতে রাশিয়ার হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এসব আক্রমণ চালানো হয়েছে। এর আগে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের ডিজিটাল অবকাঠামোয় হামলাকে ব্যঙ্গ করে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বলে উল্লেখ করেছিল।
এদিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, অনলাইন বিপণন প্রতিষ্ঠানের গুদাম এবং আর্থিক খাতের অবকাঠামোতেও হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ড্রোন হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপিয়েছে ক্রেমলিন।
একই সময়ে রাশিয়ায় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহারে বিধিনিষেধের পাশাপাশি টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো বার্তাপ্রেরণ সেবা নিয়ে সরকারি পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সেন্ট পিটার্সবার্গের আন্তনের মতে, এসব সমস্যার মুখে অনেক মানুষ ইউক্রেনকে দায়ী করার বদলে যুদ্ধ কবে শেষ হবে, সেই প্রশ্ন করছেন।
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখতে ইউক্রেনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইয়ানডেক্সের তথ্যকেন্দ্রে হামলা রাশিয়ার অভ্যন্তরে দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে এনেছে।
সূত্র: সিএনএন।




