চীনের ড্রোন শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব ড্রোন উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বিদেশি ড্রোনের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে।

নতুন নীতির আওতায় ৫৫ পাউন্ড বা প্রায় ২৫ কেজির বেশি ওজনের ড্রোন এবং থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ড্রোনের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। তুলনামূলক ছোট ড্রোনের ক্ষেত্রে শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ শতাংশ।

বিশ্ববাজারে এই শ্রেণির ড্রোনের বড় একটি অংশ চীনে উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে দাবানল পর্যবেক্ষণ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তামূলক কাজে থার্মাল ড্রোনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে।

গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের এক তদন্তে বিদেশি ড্রোন ও যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, ড্রোন প্রযুক্তিতে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা দ্রুত কমানো প্রয়োজন। ধারণা করা হয়, চীনের শেনজেনভিত্তিক ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডিজেআই একাই বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি বাণিজ্যিক ড্রোন উৎপাদন করে।
তবে নতুন শুল্ক নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান দেশীয় ড্রোন শিল্প চীনা পণ্যের তৈরি বিশাল বাজারঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে সক্ষম হবে না। ফলে জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে এই নীতি ব্যবসা ও জননিরাপত্তা খাতে বেশি ক্ষতি করতে পারে।
ক্লিভল্যান্ডের উপকণ্ঠে পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের নিয়ে গঠিত ‘লেক কাউন্টি ড্রোন ইউনিট’-এর প্রধান স্কট ম্লাকার বলেন, নতুন শুল্ক তাদের মতো সংস্থার ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে যেসব সামাজিক ও জননিরাপত্তামূলক প্রতিষ্ঠানের থার্মাল ড্রোন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের জন্য এসব ড্রোন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

তার ভাষ্য, বিদেশি প্রতিযোগিতা কমিয়ে মার্কিন নির্মাতাদের সুবিধা দেওয়ার জন্য শিল্পখাতের লবিংয়ের ফলেই মূলত এই সিদ্ধান্ত এসেছে। তার মতে, এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় না হয়ে এক ধরনের সংরক্ষণবাদী নীতিতে পরিণত হয়েছে।
ম্লাকার জানান, রাতে নিখোঁজ শিশুদের খোঁজ করা থেকে শুরু করে অপরাধী ও সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে তাদের ইউনিট প্রতিদিন থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করে।
চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে। তবে নতুন শুল্কের কারণে সেই পরিকল্পনাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মিত্র দেশগুলো কিছুটা ছাড় পেলেও পুরোপুরি শুল্কমুক্ত থাকছে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড ও তাইওয়ানে উৎপাদিত ড্রোনের ওপর ১৫ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত ড্রোনের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) থার্মাল ইমেজিং ও এরোসল স্প্রে করার মতো প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ড্রোনকে ‘সামরিক গ্রেড’ হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের প্রস্তাব করেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং জননিরাপত্তা সংস্থার ব্যবহৃত ড্রোনের ওপর কার্যত পেছনের তারিখ থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে।

গত বছরের ডিসেম্বরে এফসিসি বিশেষ কোনো ছাড় ছাড়া বিদেশি নির্মাতাদের নতুন ড্রোন মডেল বিক্রি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন অবশ্য পূর্বে অনুমোদিত মডেল আমদানি ও উড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে পুরোনো অনেক মডেলের আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যান্য অনেক শুল্কের মতো এই শুল্কও ভবিষ্যতে কমিয়ে আনা হতে পারে বলে আশা করছেন ড্রোন ব্যবহারকারীদের অনেকে। তবে লাস ভেগাসে চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একটি বাণিজ্যিক ড্রোন প্রদর্শনীতে এফসিসির প্রস্তাবটি ব্যাপক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
আকাশচিত্রগ্রাহক ভিক মস বলেন, প্রস্তাবটি বর্তমান অবস্থায় অনুমোদিত হলে পুরো ড্রোন শিল্পের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। কারণ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর দেশীয় বিকল্প নেই।
নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহারকারী ভার্জিনিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডব্লিউ.এম. জর্ডান’-এর ড্রোন পাইলট জাস্টিন জোন্সও এফসিসির প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, নতুন নীতি কোম্পানিটির বর্তমান ড্রোনবহরকেও প্রভাবিত করতে পারে এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্প ড্রোন ভাড়া দেওয়া ওয়াশিংটনের সেন্ট্রালিয়াভিত্তিক ‘ব্লু স্কাইস ড্রোনস’-এর ডেল হিলটনও সতর্ক করে বলেছেন, এফসিসির পরিকল্পনা একটি প্রতিষ্ঠিত ও প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক শিল্পের পাশাপাশি জননিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প পরিবারের দুই সদস্যেরও যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন শিল্পের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ‘ডোমিনারি হোল্ডিংস’-এর শেয়ারহোল্ডার ও উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য। প্রতিষ্ঠানটি ফ্লোরিডাভিত্তিক ড্রোন নির্মাতা ‘পাওয়ারাস’-এ বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন যন্ত্রাংশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘আনইউজুয়াল মেশিনস’-এর উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।