রাশিয়ার ওপর আরোপিত একাধিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগেই সেগুলোর বেশ কয়েকটি স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরোধ বাড়ার মধ্যে শুক্রবার রাতে জারি করা এক নির্বাহী আদেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
গত সেপ্টেম্বরে কংগ্রেসে পাস হওয়া এবং ট্রাম্পের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হওয়া নিষেধাজ্ঞাগুলোর লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো। তবে নতুন নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন।
ভার্জিনিয়ার কংগ্রেস সদস্য ডন বেয়ারসহ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, এতে মস্কোর প্রতি ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, এ পদক্ষেপ রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাব দিতে কংগ্রেসের নেওয়া উদ্যোগের উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করছে।
নতুন আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল ট্রাম্পকে। এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। পাশাপাশি রুশ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিধিনিষেধ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজের ‘ছায়া নৌবহরের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও ছিল। নির্বাহী আদেশে এসব বিধানের বেশ কয়েকটি স্থগিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মতবিরোধ গত সপ্তাহে আরও প্রকাশ্যে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সুযোগ তৈরিতে ট্রাম্প প্রশাসন কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে। ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে ছাড় দিলে দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান বাড়তে পারে। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, পুতিনের তুলনায় জেলেনস্কির সঙ্গে সমঝোতা করা বেশি কঠিন। জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক সম্মেলনে জেলেনস্কি ‘প্রকৃত নেতাদের’ সঙ্গে থাকতে পেরে আনন্দিত বলে মন্তব্য করেন।
দুই দেশের বিরোধের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ রাখার সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। জেলেনস্কি বলেছিলেন, রাশিয়া হামলা বন্ধ করলে ইউক্রেনও তা করবে। তবে পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার হামলার অভিযোগ তুলে ইউক্রেন আবার রুশ তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করে। এ পদক্ষেপকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। জবাবে জেলেনস্কি বলেন, তিনি ইউক্রেনের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছেন।
এদিকে ইউক্রেনে ব্যবহৃত স্টারলিংক সেবায় বিঘ্ন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের দাবি, স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে ড্রোন পরিচালনায় সমস্যা হয়েছে এবং কিছু সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে। শুক্রবার জেলেনস্কি জানান, স্টারলিংকের গতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জ্বালানি বাণিজ্যে ছাড় এবং ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ধারাবাহিক মতবিরোধে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্ক আরও চাপে পড়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতায় কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি




