দুর্গাপূজা মানেই উৎসব, আনন্দ আর শক্তির আরাধনা। ঢাকের শব্দ, শিউলির সুবাস, কাশফুলের দোলা আর আলোকসজ্জায় মুখর হয়ে উঠবে চারপাশ। দুর্গার পর লক্ষ্মী, কালী ও জগদ্ধাত্রীপূজায় দেবীর বন্দনায় মেতে উঠবে ঘর ও মন্দির।
আমরা দেবীকে শক্তি, সাহস, মমতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক মনে করি। কিন্তু দেবীর সামনে মাথা নত করার পর ঘরে ফিরে, কর্মস্থলে কিংবা পথে-ঘাটে নারীর প্রতি আমাদের আচরণ কেমন থাকে? প্রতিমায় যে নারী শক্তির প্রতীক, বাস্তব জীবনের নারী কি সেই সম্মান ও নিরাপত্তা পান?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে উৎসবের সৌন্দর্যের বাইরে তাকাতে হবে। কারণ নারীসম্মান কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি প্রতিদিনের আচরণ, পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়।
ঘরের ভেতরেও কি নারী নিরাপদ?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারী নির্যাতনবিষয়ক জরিপে ২৭ হাজার ৪৭৬ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জরিপে দেখা গেছে, ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। গত এক বছরেও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪৯ শতাংশ নারী।
আরও উদ্বেগের বিষয়, স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানাননি। নারী নির্যাতনবিষয়ক হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে জানেন মাত্র ১২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী।
এ পরিসংখ্যানের অর্থ স্পষ্ট—নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অনেক নারী নীরব থাকেন। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের মুখ খুলতে বাধা দিতে পারে। তাই শুধু আইন থাকলেই হবে না; প্রয়োজন অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ, পরিবারের সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রের কার্যকর সুরক্ষা।
আমরা মেয়েদের প্রায়ই বলি, বাইরে সাবধানে থাকতে। কিন্তু ২০২৪ সালের জরিপে ৫৪ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, জীবনের কোনো এক সময়ে তারা স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অর্থাৎ নারীর নিরাপত্তার প্রশ্ন কেবল বাইরের পরিবেশের নয়; নিজের ঘরের সম্পর্কও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মেয়ের স্বপ্নের মূল্য কতটা?
একটি কন্যাশিশুর জন্মের সঙ্গে তার অধিকারও জন্ম নেয়। তার শিক্ষা, নিরাপত্তা, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। অথচ এখনো সমাজের কোথাও কোথাও ছেলে সন্তানকে ভবিষ্যতের ভরসা আর মেয়েকে দায়িত্ব বা বোঝা হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে।
মেয়ের পড়াশোনায় অনীহা, চলাফেরায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ, অল্প বয়সে বিয়ের চাপ কিংবা ‘মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কী হবে’—এ ধরনের কথা তার স্বপ্নকে ছোট করে দেয়।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া, অল্প বয়সে মাতৃত্ব, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার সম্পর্ক রয়েছে। এটি অনেক মেয়ের সামনে থাকা সম্ভাবনার পথও সংকুচিত করে।
মেয়েকে নিরাপদ রাখার অর্থ তাকে ঘরে আটকে রাখা নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে পড়াশোনা করতে পারবে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে এবং নিজের জীবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবে।
পণপ্রথা এখনো কেন টিকে আছে?
বিয়ে ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বের সম্পর্ক। কিন্তু পণপ্রথা সেই সম্পর্ককে আর্থিক লেনদেনে পরিণত করে। টাকা, স্বর্ণালংকার, আসবাব কিংবা অন্য সামগ্রীর দাবি মেয়ের পরিবারকে চাপে ফেলে। দাবি পূরণ না হলে অপমান ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটতে পারে।
বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুক দেওয়া-নেওয়া এবং এ কাজে সহায়তা করা অপরাধ। তবু সামাজিকভাবে এ প্রথাকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে আইন একা সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
যে পরিবার যৌতুক দাবি করে, যে পরিবার মেয়ের পক্ষ থেকে কী দেওয়া হবে তা নিয়ে প্রত্যাশা রাখে, কিংবা যে সমাজ এসবকে বিয়ের স্বাভাবিক অংশ মনে করে—তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে।
পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক অবস্থান। মেয়ের বিয়ে কোনো লেনদেন নয়, তার মর্যাদা কোনো উপহার বা সম্পদের ওপর নির্ভরশীল নয়—এই বিশ্বাস পরিবারে ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
নারীর পেশা নয়, যোগ্যতাই হোক পরিচয়
একজন নারী চাকরি করতে বাইরে গেলে তার কাজ, সহকর্মী, পোশাক কিংবা ফেরার সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কখনো নিরাপত্তার অজুহাতে তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কখনো ব্যক্তিগত জীবনকে পেশাগত যোগ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করা হয়।
একজন পুরুষের চাকরি যেমন স্বাভাবিক পেশাগত পরিচয়, নারীর ক্ষেত্রেও তা-ই হওয়া উচিত। নারী শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী কিংবা শ্রমিক—যে পেশাতেই থাকুন, তার কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে।
নারীর স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়; বরং নিজের জীবন ও পেশা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। তাকে সম্মান করার অর্থ তার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, বরং তার মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া।
একইভাবে রাস্তায় উত্ত্যক্ত করা, গণপরিবহনে হয়রানি, কর্মস্থলে যৌন হয়রানি কিংবা অনলাইনে ছবি ছড়িয়ে ভয় দেখানোর ঘটনায় ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা অন্যায়। অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে অপরাধীর।
২০২৪ সালের জাতীয় জরিপে প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থাকা নারীদের ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এ ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ এখন বাস্তব জগতের পাশাপাশি অনলাইনেও জরুরি।
পরিবর্তনের শিক্ষা শুরু হোক ঘর থেকে
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন, পুলিশের কার্যকর ভূমিকা, দ্রুত বিচার, কর্মস্থলে সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পরিবারের ভেতরেও পরিবর্তন আনতে হবে।
ছেলেদের শেখাতে হবে, নারীর প্রতি সম্মান কোনো দয়া নয়। কারও অনিচ্ছাকে অগ্রাহ্য করা, বিরক্ত করা, অশালীন মন্তব্য করা কিংবা অনলাইনে অপমান করা গ্রহণযোগ্য নয়। ঘরের কাজ নারী-পুরুষ সবার দায়িত্ব। বোনের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা ভালোবাসা নয়, স্ত্রীর উপার্জনকে নিজের অধিকার মনে করাও নয়।
নির্যাতনের শিকার নারীকে নীরব থাকতে বাধ্য করা বা পরিবারের সম্মানের অজুহাতে তার অভিযোগ চাপা দেওয়াও বন্ধ করতে হবে। তার কথা শুনতে হবে, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে এবং বিচার পাওয়ার পথে পাশে দাঁড়াতে হবে। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের কথাবার্তা, সিদ্ধান্ত ও আচরণেই সেই সম্মানের প্রকাশ ঘটতে হবে।
উৎসবের সঙ্গে হোক নতুন অঙ্গীকার
দুর্গাপূজায় আমরা শক্তি চাই, লক্ষ্মীপূজায় সমৃদ্ধি কামনা করি, কালীপূজায় অশুভ শক্তির বিনাশ প্রার্থনা করি। কিন্তু জীবনের নারীরা যদি ভয়, নির্যাতন, বৈষম্য ও অবমূল্যায়নের মধ্যে থাকেন, তাহলে আমাদের আরাধনার সামাজিক তাৎপর্য কোথায়?
কন্যাশিশুকে ভাইয়ের সমান সুযোগ দেওয়া, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা, যৌতুকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, নারীর কর্মজীবনকে সম্মান করা এবং নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে থাকা—এসবই নারীসম্মানের বাস্তব প্রকাশ।
দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গল চাইব, তখন একবার ভাবা দরকার—আমরা কি ঘরের মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি? আমরা কি নারীর স্বাধীনতাকে সম্মান করি? আমরা কি অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, নাকি নীরব থেকে তাকে টিকিয়ে রাখি?
প্রতিমার দেবীকে ফুল, ধূপ ও প্রদীপ দিয়ে পূজা করা যায়। কিন্তু জীবন্ত নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রতিদিনের দায়িত্বশীল আচরণ, সমান অধিকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান। দেবীর আরাধনা পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন মণ্ডপের বাইরের নারীরাও নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে পারবেন।
এবার দুর্গাপূজা হোক শুধু উৎসবের নয়, নারীসম্মান প্রতিষ্ঠারও অঙ্গীকার। প্রতিমায় দেবী, জীবনে নারী—দুজনের মর্যাদার ব্যবধান ঘোচানোই হোক আমাদের সামাজিক সাধনা।




