ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তি সতর্ক অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা, নাশকতা এবং শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা মোকাবিলায় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের রাজনৈতিক মিত্রদেরও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার কথা জানানো হয়েছে।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশেষ নজরদারি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার পাশাপাশি গাজীপুর, আশুলিয়া, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও গোপালগঞ্জকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সরকারের কাছে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি প্রশাসন এবং দলীয় সাংগঠনিক পর্যায় থেকেও পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
রবিবার (২ নভেম্ববর) চিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। ডিসেম্বরকে ঘিরে কোনো পক্ষ যাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে জন্য করণীয় নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সরকারের অভিযোগ, তৈরি পোশাক খাতের সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কিছু শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। শ্রমঘন এলাকায় অশান্ত পরিবেশ তৈরি করে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করাই সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্য বলে সরকারের ধারণা। অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষ্য, কিছু শিল্পমালিক এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শ্রমিকদের ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছেন। এসব ব্যক্তির মধ্যে অতীতে সরকারের বিভিন্ন পদে থাকা কয়েকজনও রয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে মুখোশধারী কিছু ব্যক্তি প্রবেশ করে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় আন্দোলনের নামে সহিংসতা ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তার দাবি, প্রকৃত শ্রমিকদের বাইরে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে শিল্পকারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছে। সীমান্তের ওপার থেকেও উসকানি দেওয়ার তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতাও বাড়তে পারে। বিএনপি ও তাদের সহযোগী দলগুলোর নেতাকর্মীরা সতর্ক অবস্থানে থাকবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাঠে কাজ করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এরই মধ্যে আশুলিয়ায় এমন তৎপরতা দেখা গেছে। গতকাল সকাল থেকে বাইপাইল থেকে জিরাবো পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে টহল দিয়েছেন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর লক্ষ্যেই তাদের এ কর্মসূচি বলে জানা গেছে।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা যেন নিজেরা কোনো সংঘর্ষে না জড়ান, সে বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি আন্দোলনের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকৃত শ্রমিকদের যাচাই করে মুক্তির ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, আন্দোলনের অধিকার কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে না। তার অভিযোগ, আন্দোলনকে ব্যবহার করে একটি পক্ষ দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির অনুসারী বলে দাবি করেন তিনি। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ভূমিকা রাখবে বলেও জানান রিজভী।




