‘জামাই বয়সে বড়।’ মাত্র কয়েকটি শব্দ। অথচ এই তথ্যটুকুই যেন কারও কারও কাছে একটি দাম্পত্য সম্পর্কের বিচার করার যথেষ্ট কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো দম্পতির ছবি প্রকাশিত হলেই শুরু হয় বয়সের হিসাব, নানা প্রশ্ন, হাসাহাসি, ব্যঙ্গ আর অযাচিত উপদেশ। দুজন মানুষের সম্পর্কের ভেতরে কী আছে, তাঁরা একে অপরকে কতটা ভালোবাসেন কিংবা বিপদের সময় কে কার পাশে দাঁড়ান, সেসব জানার আগেই জন্মতারিখের ব্যবধান দিয়ে সম্পর্কের মূল্যায়ন শুরু হয়ে যায়। যেন বিয়ে কোনো সম্পর্ক নয়, একটি অঙ্ক।
অথচ বাস্তবতা এত সরল নয়। বয়সের ব্যবধান একটি সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ব্যবধান বেশি হলে জীবনযাপনের পর্যায়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো বিষয় সামনে আসতে পারে। কিন্তু শুধু বয়সের পার্থক্য দেখে কোনো সম্পর্ক সুখী হবে, নাকি ব্যর্থ হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার গৃহস্থালি পর্যায়ের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বয়সের ব্যবধান ও বৈবাহিক সন্তুষ্টির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, বয়সে বেশি পার্থক্য থাকা কিছু দম্পতির ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে বৈবাহিক সন্তুষ্টি তুলনামূলকভাবে বেশি কমেছে। তবে এটি ছিল একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর গড় প্রবণতা; কোনো নির্দিষ্ট দম্পতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সূত্র নয়।
তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, বয়সের ব্যবধান সম্পর্কের মধ্যে কীভাবে কাজ করছে। দুজন কি পরস্পরের কথা শোনেন? গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কি একসঙ্গে নেন? একজন কি অন্যজনের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেন? দুজনেরই কি মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে? অর্থনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ কি অন্যজনকে নিয়ন্ত্রণ করেন? এসব প্রশ্নের উত্তর একটি সম্পর্কের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারে, যা জন্মতারিখের ব্যবধান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
বয়সকে আমরা অনেক সময় চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও সম্পর্কের মানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। বয়সে বড় মানেই বেশি পরিণত বা বেশি বিচক্ষণ, আর বয়সে ছোট মানেই কম বোঝেন—এমন ধারণা তৈরি হয়। অথচ বয়স অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো মানুষ কিংবা ভালো জীবনসঙ্গী বানায় না। একইভাবে স্বামী স্ত্রীর চেয়ে বয়সে বড় হলেই সম্পর্কটি অস্বাভাবিক হয়ে যায় না।
একটি সুস্থ দাম্পত্যে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, যোগাযোগ ও আবেগগত নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী-স্ত্রী কি বন্ধুর মতো কথা বলতে পারেন? ভুল হলে কি ক্ষমা চাইতে পারেন? মতপার্থক্য হলেও কি সম্মান বজায় রাখেন? একজনের সাফল্যে অন্যজন আনন্দিত হন? কঠিন সময়ে কি একে অপরের পাশে দাঁড়ান? ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পছন্দকে কি গুরুত্ব দেন? এসব আচরণই সম্পর্কের ভিত সম্পর্কে অনেক বেশি ধারণা দেয়।
দাম্পত্য মানে শুধু একই ছাদের নিচে বসবাস নয়। এটি বন্ধুত্ব, সহযাত্রা এবং মানসিক আশ্রয়ের সম্পর্ক। একসঙ্গে হাসতে পারা, নিজের দুর্বলতার কথা বলতে পারা, মন খারাপ ভাগ করে নেওয়া, ভুল স্বীকার করা এবং অন্যের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই সম্পর্ক গভীর হয়।
একটি ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়ানো দুজন মানুষকে দেখা যায়। কিন্তু দেখা যায় না অসুস্থতার রাতে কে জেগে ছিলেন, বিপদের সময় কে হাত ধরে ছিলেন কিংবা কে নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি সঙ্গীর স্বপ্নকেও জায়গা দিয়েছেন। দেখা যায় না প্রতিদিনের ছোট ছোট ত্যাগের গল্প। অথচ সেই ছবির ওপর ভিত্তি করেই কেউ কেউ এমন মন্তব্য করেন, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য অপমানজনক ও কষ্টদায়ক হতে পারে। মন্তব্যকারী হয়তো কয়েক সেকেন্ডে কথাটি লিখে চলে যান, কিন্তু তার প্রভাব অন্য মানুষের মনে কত দিন থেকে যায়, তা তিনি জানেন না।
এখানে সমাজের দ্বৈত মানদণ্ডও লক্ষণীয়। পুরুষ বয়সে বড় হলে অনেকেই সেটিকে স্বাভাবিক মনে করেন। কিন্তু নারী বয়সে বড় হলে একই ধরনের বয়সের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন, কটাক্ষ কিংবা অস্বস্তি তৈরি হয়। অর্থাৎ বয়সের পার্থক্য একই হলেও নারী-পুরুষের পরিচয় বদলে গেলে সামাজিক বিচারও বদলে যায়। এটি আমাদের প্রচলিত ধারণার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে।
অবশ্য বয়সের ব্যবধানকে একেবারেই গুরুত্ব দেওয়া হবে না, এমন কথাও বলা যায় না। ব্যবধান বেশি হলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা, কর্মজীবন, অবসর, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক দায়িত্ব এবং পরিবারের ভূমিকা নিয়ে দুজনের খোলামেলা আলোচনা জরুরি। কিন্তু এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সম্পর্ককে বোঝা, কাউকে উপহাস করা নয়।
শুধু ভালোবাসার কথা বলে সম্পর্কের ভেতরের অসমতা, নিয়ন্ত্রণ কিংবা নির্যাতনকেও উপেক্ষা করা ঠিক নয়। কেউ যদি অন্যজনের মতামতকে গুরুত্ব না দেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেন কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তাহলে সেটি গুরুতর সমস্যা। সেখানে বয়সের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতার অসমতা, অসম্মান এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আবার দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্তে বিয়ে করলে, পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া থাকলে শুধু জন্মতারিখের ব্যবধান নিয়ে বাইরের মানুষের অস্বস্তির কারণ নেই। পরামর্শ দেওয়া আর অপমান করা এক বিষয় নয়। উদ্বেগ প্রকাশ করা আর ট্রল করাও এক নয়। কারও সম্পর্কের মধ্যে জোরজবরদস্তি, প্রতারণা, নির্যাতন কিংবা সম্মতির সমস্যা থাকলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কিন্তু শুধু স্বামী স্ত্রীর চেয়ে বয়সে বড়—এই একটি তথ্য দিয়ে পুরো সম্পর্কের বিচার করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
মানুষ জন্মায় একটি তারিখ নিয়ে, কিন্তু জীবন কাটায় সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। বয়সে ছোট হলেই কেউ বেশি দিন বাঁচবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। বয়সে বড় হলেই তিনি আগে চলে যাবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই। জীবন ও মৃত্যুর ক্রম মানুষের হাতে নয়। তাই কে আগে জন্মেছেন, সেই হিসাব দিয়ে সম্পর্কের গভীরতা মাপার চেষ্টা কতটা অর্থবহ, তা ভেবে দেখা দরকার।
একটি সংসার জন্মসনদের হিসাব দিয়ে টেকে না। সংসার টিকে থাকে বিশ্বাসে, সম্মানে, বন্ধুত্বে, পরস্পরের কথা শোনার ক্ষমতায় এবং কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়। অন্যের সংসারের ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে বয়সের হিসাব মেলানোর আগে নিজের জীবনটাও একবার দেখা যাক। আমি কি আমার সঙ্গীকে সম্মান করি? তাঁর মতামত শুনি? তাঁর স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিই? তাঁর সাফল্যে আনন্দিত হই? ভালোবাসার পাশাপাশি বন্ধুত্বও ধরে রাখতে পারি?
এসব প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আমাদের শেখাবে, একটি ভালো সম্পর্কের আসল মাপকাঠি কোথায়। কারণ বয়সের ব্যবধান তাঁদের, সংসারটাও তাঁদের, সিদ্ধান্তও তাঁদের। অন্যের জন্মসনদের হিসাব করা নয়, বরং মানুষ হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও মর্যাদাকে সম্মান করাই আমাদের দায়িত্ব।
বয়সের ব্যবধান নিয়ে হাসার আগে তাই একটু থামুন। হয়তো ছবিতে দেখা দুজন মানুষ একে অপরের কাছে এমন এক নিরাপদ আশ্রয়, যার গল্প একটি ছবিতে ধরা পড়ে না। সেই গল্প না জেনে শুধু জন্মতারিখের দুটি সংখ্যা দেখে সম্পর্কের বিচার করা আমাদের পুরোনো সামাজিক অভ্যাসেরই আরেকটি প্রকাশ। একটি সংসার কত বছরের ব্যবধানে শুরু হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেই সংসারে দুজন মানুষ কতটা সম্মান, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব নিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে পারছেন।




