দেশে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন। মে থেকে আগস্ট সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি। খাদ্যের উচ্চমূল্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বন্যায় কৃষি ও জীবিকার ক্ষতি এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা মূল্যায়ন কাঠামো ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের (আইপিসি) বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার জন জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।
খাদ্যনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকটের সঙ্গে শুধু খাদ্যের সরবরাহ নয়, মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও বাজারদরের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাজারে খাদ্যপণ্য পাওয়া গেলেও তা কেনার সামর্থ্য না থাকলে দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মূল্যস্ফীতিতে চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নিম্ন আয়ের পরিবার ও অনিয়মিত আয়ের মানুষের জন্য খাবার কেনা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে অনেক পরিবার খাবারের পরিমাণ কমাচ্ছে কিংবা তুলনামূলক কম পুষ্টিকর খাবারের ওপর নির্ভর করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ অবশ্য পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; দাম বাড়ার গতি কমলেও পণ্যের মূল্য আগের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও জীবিকা
খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগও। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং ১৩ লাখ মানুষ ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকের আয় ও কৃষিশ্রমিকের কর্মসংস্থানও ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় বাজার ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আয় স্বাভাবিক হতে দেরি হলে খাদ্য কেনার সামর্থ্যও দীর্ঘদিন দুর্বল থাকতে পারে।
দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ও জীবিকার অনিশ্চয়তার কারণে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, হাওর, উপকূলীয় জনপদ এবং শরণার্থীশিবিরসংলগ্ন এলাকাগুলোতে বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন।
শিশুদের পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ
খাদ্যসংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায় এবং ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়। এ ছাড়া দেশের প্রতি পাঁচটি পরিবারের প্রায় দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি শিশু ও মায়েদের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
চাল-আটার দাম ও সরকারি সহায়তা
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি কমপক্ষে ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও কেজিপ্রতি একই পর্যায়ে রয়েছে। এ দামে সীমিত আয়ের মানুষের খাদ্যব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে খাদ্যশস্যের মজুত প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টন।
মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো সহায়তা পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি এবং দরিদ্র পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি।
প্রবাসী আয়েও রয়েছে ঝুঁকি
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ব্যাহত হলে বহু পরিবারের আয় ও খাদ্য কেনার সামর্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও আমদানি ব্যয় এবং দেশের বাজারে পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরও পড়তে পারে।
লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তাগিদ
খাদ্যসংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার ও দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খাদ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ন্যায্যমূল্যে চাল-ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি, লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা এবং বাজারে মজুতদারি ও কারসাজি প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
শুধু সরকারি গুদামে খাদ্যশস্য মজুত রাখলেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে যথাসময়ে সহায়তা পৌঁছানো এবং তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। খাদ্যের দাম, মানুষের আয়, পুষ্টি, কৃষি উৎপাদন ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা—সবকিছুই খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে চিহ্নিত করে কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে বছরের শেষ ভাগে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।




