মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে দুই সন্তানকে হারিয়েছেন রাজধানীর মিরপুরের ভাষানটেক এলাকার বাসিন্দা মো. বাবুল হক ও নাজমিন আক্তার দম্পতি। বড় ছেলে নাজমুল হাসান ইফতি (২৪) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছোট ছেলে ইনতিসার হাসান ইয়াস (১৬) পড়ত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণিতে। দুই ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন এই দম্পতি।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ইনতিসার। এর আগে বাবা বাবুল হক ও ছোট ছেলে প্রায় একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসায় কিছুটা উন্নতির পর ইনতিসারকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হলেও পরে তার অবস্থার অবনতি ঘটে। তাকে রাজধানীর পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ওই সময় তার বাবা ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ছোট ছেলের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই অক্টোবরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় বড় ছেলে নাজমুল। তাকেও পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১২ অক্টোবর মারা যায় সে। বাবার অসুস্থতার সময় বাবার পাশে ছিল নাজমুল। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পর মা-বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকেও হারাতে হলো পরিবারকে।
মা নাজমিন আক্তারের কণ্ঠে এখন শুধুই হাহাকার। তিনি বলেন, ‘ছোট মশা আমার পরিবারের সব আনন্দ নিয়ে চলে গেল। এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো অবলম্বন রইল না।’ স্বামী হাসপাতালে থাকায় তাকে নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন তিনি। কখনো ভাবেননি, এর মধ্যে দুই সন্তানকেও হারাতে হবে।
দুই ছেলের সঙ্গে নাজমিনের সম্পর্ক ছিল গভীর। বড় হয়ে যাওয়ার পরও ছেলেদের নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন তিনি। ঘুমানোর সময় ছাড়া তারা খুব কমই মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকত। ছোট ছেলে ইনতিসার রান্না করতে ভালোবাসত। তার রান্না করা খাবার এখনো বাড়ির ফ্রিজে রাখা আছে। সেই খাবারই এখন মায়ের কাছে সন্তানের স্মৃতি।
পূজার ছুটিতে ১৮ অক্টোবর দুই ছেলেকে নিয়ে পঞ্চগড়ের পৈতৃক বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল পরিবারের। বড় ছেলে নাজমুল নিজেই ভ্রমণের টিকিট কেটেছিল। মামার সঙ্গে কলকাতা বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল দুই ভাইয়ের; সে জন্য পাসপোর্টও করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সফরের বদলে দুই সন্তানের মরদেহ নিয়ে পঞ্চগড়ে ফিরতে হয়েছে মা-বাবাকে।
নাজমিন জানান, দুই ছেলের চিকিৎসায় প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। চিকিৎসকদের বারবার বলেছিলেন, খরচ নিয়ে যেন চিন্তা না করেন। তার একটাই চাওয়া ছিল, সন্তানদের সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। বাবুল হক সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর একই প্রতিষ্ঠানে বেসামরিক পদে চাকরি করছেন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এবং দুই ছেলের মৃত্যু—সব মিলিয়ে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভালো নেই।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৩১ জন মারা গেছেন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। এর মধ্যে গত বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৪৩ জন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে রোগীর সংখ্যা ছিল বেশি।
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কয়েক দশক ধরে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৩২৩ জনের। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবরেই সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে মৃত্যুর হিসাব।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার গত সেপ্টেম্বরে তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি শুরু করে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার ও জনসচেতনতা বাড়ানো এই কর্মসূচির লক্ষ্য। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, রোগটি এখন ঢাকা ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য সারা দেশে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ প্রয়োজন।
নাজমুল ও ইনতিসারের মামা রোকনুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সরকারি হিসাবে মানুষকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্বজন হারানো পরিবারই জানে এই ক্ষতি কতটা গভীর। ২১ দিনের ব্যবধানে দুই সন্তানকে হারিয়ে বাবুল ও নাজমিনের জীবন এখন স্মৃতিনির্ভর। যে দুই ছেলেকে ঘিরে ছিল তাদের ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা, তাদের শূন্যতা নিয়েই এখন দিন কাটাতে হচ্ছে এই দম্পতিকে।




