অবৈধ ও অনিবন্ধিত মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সরঞ্জাম পরিচিতি নিবন্ধন ব্যবস্থা (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে বৈধ ফোনের দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালে আনার ওপর। কারণ, বৈধ ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে একই ধরনের ফোনের দামের ব্যবধান ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।
এনইআইআর হলো মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরভিত্তিক কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার। এর মাধ্যমে নেটওয়ার্কে যুক্ত হ্যান্ডসেটের পরিচয় যাচাই এবং চোরাই বা অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। বিটিআরসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে বৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা ফোন শনাক্ত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ফোনের নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে এনইআইআর চালু হয়েছিল। পরে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কারণে তা প্রত্যাশিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ বিষয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয়। ২০২৫ সালের জুনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ অনুমোদন দেয়। এরপর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রস্তুতি থাকলেও অবৈধ ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার সুবিধা ছাড়াই ব্যবস্থা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চলতি বছরের জুনে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার স্বার্থে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর বিষয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয়। পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাতেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এবার ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারিকে লক্ষ্য ধরে নতুন করে প্রস্তুতি চলছে।
তবে সরকার মনে করছে, শুধু অবৈধ ফোন বন্ধ করলেই ক্রেতারা বৈধ সেট কিনতে উৎসাহিত হবেন না। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম গণমাধ্যমকে বলেছেন, রাজস্ব বাড়াতে অবৈধ ফোন বন্ধ করা প্রয়োজন। তবে ক্রেতাদের ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। কম দামে বৈধ ফোনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বৈধ ফোনের দাম কমাতে চলতি বছরের শুরুতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল বৈধ ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের দামের ব্যবধান কমানো। কিন্তু ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে প্রায় ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া একটি ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনের দাম সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রায় ১৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। বছরের শেষ নাগাদ সবচেয়ে কম দামের স্মার্টফোনের দামও ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উৎপাদকেরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের দাম ও সরবরাহসংকট ফোন উৎপাদনের ব্যয় বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং ও শাওমির অনেক উন্নত মডেল দেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। ফলে এসব ফোন আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
দেশে মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজনশিল্পের বিকাশ ঘটলেও সব ধরনের উন্নত ফোনের বিকল্প তৈরি হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যামেরা, পর্দা, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক পর্যালোচনা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে।
বৈধ ফোন উৎপাদকদের দাবি, অনানুষ্ঠানিক বাজারে বিক্রি হওয়া ফোনের অন্তত ৭৫ শতাংশ পুরোনো বা পুনর্নির্মিত। তবে ক্রেতাদের কাছে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো দাম। তাই সাশ্রয়ী দামে বৈধ ফোনের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে অনানুষ্ঠানিক বাজারের চাহিদা কমানো কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, এনইআইআর চালুর মাধ্যমে অবৈধ ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব ক্ষতি কমানোর লক্ষ্য থাকলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বৈধ ফোনের দাম কমানোর ওপর।