দীর্ঘ বিরতির পর ভারতের আসাম রাজ্যের ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনে নতুন একটি নৌপথ ব্যবহার শুরু হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ব্রহ্মপুত্র নদের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করে একটি পণ্যবাহী বার্জ। এই উদ্যোগকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিথানল উৎপাদন করেছে আসাম সরকারের প্রতিষ্ঠান আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের নামরূপ কারখানা। ‘ডিএলবি পাটকাই’ নামের বার্জটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ‘কুশল কোঁয়র’ নামের একটি টাগবোট।ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয় এ যাত্রাকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই চালানের বিশেষত্ব হলো, আসামের ডিব্রুগড় থেকে উৎপাদিত বাণিজ্যিক পণ্য সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরের উদ্দেশে নদীপথে পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্রকে ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কোন পথে আসবে পণ্য?
 পরিকল্পনা অনুযায়ী, পণ্যবাহী জাহাজটি ভারতের জাতীয় নৌপথ-২ দিয়ে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর দুই দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বাণিজ্য প্রটোকলের আওতাভুক্ত পথ ধরে বাংলাদেশের ভেতরে এগিয়ে যাবে। বগিবিল থেকে পানগাঁও পর্যন্ত যাত্রাপথের মোট দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষ আসামের সাদিয়া থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় নৌপথ-২ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই নদীপথ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনের জন্য নতুন বিকল্প পাবেন।
দেশভাগে বিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক যোগাযোগ
 একসময় ব্রহ্মপুত্রের ঘাটগুলোকে কেন্দ্র করে ডিব্রুগড়ে নদীবাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল। বিশেষ করে চা পরিবহনে নদীপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। পরবর্তী সময়ে রেলপথের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য কমে আসে। ১৯৫৬ সালে ডিব্রুগড়ের পুরোনো নদীঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঐতিহাসিক যোগাযোগের একটি অধ্যায়ও শেষ হয়। নতুন এই চালান সেই হারানো বাণিজ্যিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের নদীপথ ব্যবহার করে আসামের পণ্য দেশের বিভিন্ন বাজার এবং সমুদ্রবন্দরমুখী পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এতে শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে সড়ক ও রেলপথে পণ্য পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
নিয়মিত পরিবহনই হবে বড় পরীক্ষা
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই উদ্যোগকে রাজ্যের জন্য গর্বের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে একটি চালান সফলভাবে পাঠানোই দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। পণ্য পৌঁছাতে কত সময় লাগে, পরিবহন ব্যয় কতটা কমে এবং বন্দরে খালাসের প্রক্রিয়া কতটা সহজ হয়—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের জলপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নজির আগেও রয়েছে। ২০২২ সালে টাটা স্টিলের পণ্যবাহী বার্জ বাংলাদেশের নদীপথ অতিক্রম করে ভারতের পান্ডুতে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে পর্যটকবাহী জাহাজ ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ও বাংলাদেশ অতিক্রম করে ডিব্রুগড়ের পথে যাত্রা করেছিল। তবে এবারের উদ্যোগের গুরুত্ব হলো, আসাম থেকে বাণিজ্যিক পণ্য সরাসরি বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো। নিয়মিত চালান ও ফিরতি পথে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, পরীক্ষামূলক এই যাত্রা কত দ্রুত নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বাণিজ্যিক রুটে পরিণত হয়।