তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কাছে চিঠি পাঠিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। নতুন মজুরিকাঠামোর প্রত্যাশার মধ্যে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বৃহস্পতিবার মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনকে চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতির কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছে।
বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসের শুরুতে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তখন অক্টোবরের মধ্যেই বোর্ড গঠনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রতিনিধি মনোনয়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সেই উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে।
তিন বছর পর মজুরি পর্যালোচনার সুযোগ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক পোশাকশ্রমিক। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।
শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। পোশাকশ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে, যা কার্যকর হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। সে হিসাবে আগামী নভেম্বরে মজুরি ঘোষণার তিন বছর পূর্ণ হবে।
২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। ওই সময় সাতটি গ্রেডের পরিবর্তে পাঁচটি গ্রেডে মজুরিকাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিনিধিদের নাম দেবে সংশ্লিষ্ট সংগঠন
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছেন তাঁরা। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নাম চূড়ান্ত করে পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, সরকার শুরু থেকেই মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক। তবে একটি গোষ্ঠী আন্দোলনের মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদ জানান, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের বিষয়টি সমন্বয় করবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলকে। চিঠিতে নাম জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও দ্রুত নাম পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ
এদিকে মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য দাবিতে টানা তিন দিন ধরে রাজধানীর উত্তরায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে তাঁরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আজমপুর এলাকায় অবস্থান নেন। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
গত বুধবার গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যেত, ২০২৬ সালে তা কিনতে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের আয় একই অনুপাতে বাড়েনি।
গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, মজুরি বোর্ডে প্রকৃত শ্রমিক প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার দাবি জানান তিনি। তার মতে, খাদ্যপণ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বোর্ড গঠনের পর প্রতিনিধি মনোনয়ন ও কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন শ্রমিকেরা। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন মজুরিকাঠামো নির্ধারণ করা হবে।




