আর মাত্র কয়েক দিন পরই হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্যামাপূজা (কালীপূজা) ও আলোর উৎসব দীপাবলি। উৎসবকে ঘিরে মাটির প্রদীপ (দিয়ারি) তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কুমারপল্লীর মৃৎশিল্পীরা। উৎসবের বাড়তি চাহিদা মেটাতে প্রায় ১৪-১৫ দিন ধরে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা। পরিবারের নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোররাও এ কাজে সহযোগিতা করছে। কারও যেন দম ফেলার ফুরসত নেই।
কালীপূজা ও দীপাবলি উপলক্ষে প্রতিবছরই মাটির তৈরি প্রদীপের চাহিদা বেড়ে যায়। বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মাটির প্রদীপের আলোয় ঘরবাড়ি ও পূজামণ্ডপ সাজানো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের রীতি। আর এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই ফুলবাড়ীর কুমারপল্লীতে বেড়েছে কর্মব্যস্ততা।
সম্প্রতি ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের চন্দ্রখানা কুমারপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, মাটির প্রদীপ তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। শুধু পুরুষরাই নন, পরিবারের নারীরাও সমানতালে কাজ করছেন। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ প্রদীপ তৈরি করছেন, আবার কেউ সেগুলো শুকানো ও সাজানোর কাজে ব্যস্ত। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার মাটির প্রদীপ।
এসব প্রদীপের চাহিদা শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। কালীপূজা ও দীপাবলিকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীর তৈরি মাটির প্রদীপ বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে পাশের লালমনিরহাটের বড়বাড়ি, নয়ারহাটসহ বিভিন্ন এলাকার বাজারে। এ ছাড়া ফুলবাড়ী ও আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারেও বিক্রি করেন মৃৎশিল্পীরা।
একসময় মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্রের চাহিদা ও আয় ভালো থাকলেও বর্তমানে এ পেশায় লাভের পরিমাণ অনেক কমেছে। তারপরও বাপ-দাদার পেশা ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাঁরা। সারা বছর মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির পাশাপাশি দীপাবলি উপলক্ষে প্রদীপ তৈরি তাদের পরিবারের বাড়তি আয়ের অন্যতম অবলম্বন।
মৃৎশিল্পী বিষ্ণু চন্দ্র পাল ও তাঁর স্ত্রী টুম্পা রানী পাল জানান, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কালীপূজা ও দীপাবলির আগে মাটির প্রদীপের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। এ সময় প্রদীপ বিক্রি করে কিছুটা বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে কাজে নেমেছেন তারা।
তারা জানান, এ বছর প্রায় ২০ হাজার মাটির প্রদীপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এক-দুই দিনের মধ্যেই সব প্রদীপ তৈরির কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন তাঁরা। এরই মধ্যে বাড়িতে বসেই প্রতি ১০০টি প্রদীপ ৫০ টাকা দরে ১০ হাজার প্রদীপ বিক্রি করেছেন। বাকি প্রদীপগুলো ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট, গংগাহাট, খরিবাড়ী, নেওয়াশী, নাগেশ্বরীর গাগলা বাজারসহ লালমনিরহাটের বড়বাড়ি ও নয়ারহাটে নিয়ে বিক্রি করবেন। এসব বাজারে প্রতি ১০০টি প্রদীপ ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রির আশা করছেন তাঁরা।
বিষ্ণু চন্দ্র পাল জানান, ১৩ দিনের কট্টর পরিশ্রমসহ ২০ হাজার প্রদীপ তৈরিতে মাটি, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ হয় ৪ হাজার টাকা। তিনি দিয়ার বিক্রি করে ৬ হাজার টাকা আয় করার আশা করছেন।
একই পল্লীর মৃৎশিল্পী তাপস কুমার পাল (৪০), আনন্দ কুমার পাল (৫০) ও বেরেন চন্দ্র পাল (৫২) জানান, তাঁদের মধ্যে কেউ ১৫ হাজার, কেউ ১০ হাজার আবার কেউ ৫ হাজার প্রদীপ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রায় ১২ দিন ধরে কাজ করছেন। এ কাজে তাঁদের স্ত্রী-সন্তানেরাও সমানভাবে সহযোগিতা করছেন।
তারা বলেন, আগের তুলনায় মাটির দাম বেড়েছে, বেড়েছে জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের খরচও। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি প্রদীপের দাম।
১৫ থেকে ২০ বছর আগে এ পেশায় যে পরিমাণ আয় হতো, বর্তমানে তার ধারেকাছেও নেই। তারপরও বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাধ্য হয়েই এ পেশায় টিকে আছেন তাঁরা। প্রদীপ তৈরিতে লাভ কম হলেও দীপাবলির সময়টাতে বাড়তি কিছু আয়ের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করেন। উৎসবের ব্যস্ততা শেষ হলে আবারও হাঁড়ি, পাতিলসহ মাটির তৈরি অন্যান্য সামগ্রী তৈরির কাজে ফিরবেন তারা।
মৃৎশিল্পীরা আরও জানান, ফুলবাড়ীর চন্দ্রখানা কুমারপাড়ায় প্রায় ১০০টি পরিবার বংশপরম্পরায় মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এসব পরিবারের জীবিকা মূলত এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। তবে দিন দিন আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারই আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি সুনীল চন্দ্র রায় জানান, আগামী ৮ নভেম্বর (রোববার) অমাবস্যা তিথিতে মহাশক্তিরূপিণী, দুর্গতিনাশিনী শ্রীশ্রী শ্যামা মায়ের পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবছরের মতো এবারও শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উপলক্ষে কুমারপল্লীগুলোতে মাটির প্রদীপের চাহিদা বেড়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজামণ্ডপের পাশাপাশি নিজেদের বাড়িঘরও ঐতিহ্যবাহী মাটির প্রদীপের আলোয় আলোকিত করবেন।
তারা আরও বলেন, ফুলবাড়ীর কুমারপাড়ার প্রায় ১০০টি পরিবার বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রেখে এখনো এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু আগের তুলনায় তাদের আয় অনেক কমে গেছে। অধিকাংশ পরিবারই কষ্টে জীবনযাপন করছে। মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এসব পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতা ও সুদৃষ্টি প্রয়োজন।
একদিকে দীপাবলির আলো ছড়াতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন ফুলবাড়ীর মৃৎশিল্পীরা। তাদের হাতে তৈরি হাজারো মাটির প্রদীপের আলোয় উৎসবের রাতে আলোকিত হবে ঘরবাড়ি ও পূজামণ্ডপ। সেই আলোর পেছনে মিশে থাকবে মাটির কারিগরদের দীর্ঘদিনের শ্রম, বংশপরম্পরায় বয়ে চলা ঐতিহ্য আর একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।


