বাবা আর ফিরবে না—এ কথা বোঝার বয়স হয়নি সাত মাসের আহরামের। বড় ছেলে আয়ানের বয়স ১০ বছর। স্বামী ওয়াহিদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমের মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা নাজমা খাতুন। একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
সাতক্ষীরার দেবহাটায় স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত কথোপকথনের একটি অডিওকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠার পর শামীমের বাড়িতে হামলা এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুই দফা মারধরের ঘটনা ঘটে। পরিবারের অভিযোগ, তিন দফা গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান শামীম। ঘটনাটি ঘিরে হামলাকারীদের ভূমিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির অভিযোগ এবং পুলিশের উপস্থিতিতে হাসপাতালে হামলার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাত ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে শামীমকে দাফন করা হয়। এর আগে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. আরাফাত হোসেন জানান, ভারী বস্তু দিয়ে আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে শামীমের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল।
অডিও ঘিরে উত্তেজনা
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর স্ত্রী নাজমার সঙ্গে পারিবারিক বিষয় নিয়ে শামীমের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়েও বিরোধ দেখা দেয়। পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী আবুল কাশেম সরদারের ছেলে হোসেন আলী সরদার কথোপকথনটি মুঠোফোনে ধারণ করেন। পরে অডিওটি স্থানীয় জামায়াত কার্যালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায় বলে দাবি স্বজনদের।
শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তবে অডিওতে কী বলা হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিন দফা হামলার অভিযোগ
নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিলের অভিযোগ, ১২ অক্টোবর এশার নামাজের পর ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে বড় শান্তা গ্রামের শামীমের বাড়িতে হামলা চালায়। বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি শামীমকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় পারুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের আমির কামরুল ইসলাম গাজী, সেক্রেটারি আব্দুস সামাদ মোড়ল এবং আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে পরিবার। মজিদুল ইসলাম সরদারের বিরুদ্ধে শাবল দিয়ে আঘাত করার অভিযোগও করেছেন স্বজনেরা।
আহত শামীমকে প্রথমে কুলিয়া বাজারের পল্লিচিকিৎসক আব্দুস সবুরের চেম্বারে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দ্বিতীয় দফায় তাঁর ওপর হামলা হয়। এ ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্বজনেরা। পরে গুরুতর আহত শামীমকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ওই রাতেই ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভে এসে লোকজনকে পারুলিয়া বাজারে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসাধীন শামীমকে আবারও মারধর করে। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করলেও পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক দীপঙ্কর মণ্ডল জানান, শামীমকে জরুরি বিভাগে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
থানার ডিউটি অফিসার এসআই ইব্রাহিমের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর ওসিকে জানানো হয়। পরে একজন উপপরিদর্শকের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আনসার সদস্যরাও দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানান, পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। পরে বিক্ষুব্ধ লোকজন হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে আবারও মারধর করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তাঁর ভাষ্য, পরিবারের পক্ষ থেকে তখনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি; তবে মামলা করার বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।
ওসি আরও জানান, ফেসবুক লাইভ ও স্ট্যাটাস পুলিশের নজরে এসেছে। হাসপাতাল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ফজলুল হক আমিনী দাবি করেছেন, শামীম দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ধর্মীয় বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিলেন। তিনি বলেন, ‘তৌহিদী জনতা’ গণপিটুনি দিয়ে শামীমকে পৃথিবী থেকে বিদায় করেছে। অন্যদিকে, শামীমকে মারধরের ভিডিওতে আমিনী ও কুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদিকুল ইসলামের উপস্থিতি ও ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। আব্দুস সামাদ বলেছেন, ধর্মীয় বিষয়ে বিরূপ মন্তব্যের অভিযোগে লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়েছিল এবং তিনি তাদের সঙ্গে ছিলেন মাত্র। কামরুল ইসলাম গাজীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
আগের ঘটনাও সামনে
স্থানীয় সূত্রের বরাতে ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে এর আগে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগের কথা জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে পারুলিয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। একই বছরের অক্টোবরে কুলিয়া ইউনিয়নে সোহাগ হোসেনের বাড়িতে হামলা এবং কোমরপুরে এক নারী ইউপি সদস্যের বাড়িতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
শামীমের মৃত্যুর পর মরদেহ দাফন নিয়েও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে পরিবার। স্বজন মনিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, শামীমের কবর খোঁড়া ও জানাজা পড়তে বাধা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল ও ছোট ভাই তাহসিভ রহমান সাগরের দাবি, শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তাঁর কোনো কথায় অপরাধ হয়ে থাকলে আইনের মাধ্যমে বিচার করা যেত। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যায় জড়িতদের বিচার দাবি করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে পিটিয়ে হত্যার অধিকার কারও নেই। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ব্যক্তিগত কথোপকথনের অডিও কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল, কারা লোকজনকে উত্তেজিত করল এবং পুলিশ ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতেও হাসপাতালে হামলা কীভাবে ঘটল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।




