একটি গরু, একটি পরিবারের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঝিনাইদহের মহেশপুরে অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে মানবাধিকার ও উন্নয়নমূলক সংস্থা রুরাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আরডিসি)। বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের (বিএনএফ) আর্থিক সহযোগিতা এবং আরডিসির সার্বিক তত্ত্বাবধানে গরু বিতরণ প্রকল্পের মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে হতদরিদ্র পরিবারের জীবনমান।
গরু পালন করে অনেক পরিবার এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও চালাতে পারছে।
উপজেলার ফতেপুর ও নাটিমা ইউনিয়নের হতদরিদ্র, অসহায় বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও ভূমিহীন পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় পর্যায়ক্রমে ৩৩টি পরিবারের মধ্যে বিনামূল্যে গাভী ও বকনা বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ১১টি পরিবারের হাতে ১১টি গরু তুলে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আরও পরিবারকে এ সহায়তার আওতায় আনা হয়।
প্রকল্পের সুফলভোগীদের একজন ফতেপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণচন্দ্রপুর আদিবাসী পাড়ার এসা রানী। একসময় অভাব-অনটনের কারণে তাঁর পরিবারের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত কষ্টের। সংসারের প্রয়োজনে সন্তানদের অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হতো। কিন্তু বিএনএফের অর্থায়নে আরডিসির মাধ্যমে একটি গরু পাওয়ার পর বদলে যেতে শুরু করে তাদের ভাগ্য। সেই একটি গরু থেকে বর্তমানে তার গোয়ালে রয়েছে তিনটি গরু। গাভীর দুধ বিক্রি ও বাছুর থেকে সম্পদ বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবারে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা। তার ছেলেমেয়েরা এখন অন্যের বাড়িতে কাজ না করে নিয়মিত স্কুলে পড়াশোনা করছে।
শুধু এসা রানী নন, প্রকল্পের আওতায় গরু পাওয়া অনেক পরিবারই এখন স্বাবলম্বিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ সুফলভোগীর গরু থেকে এক থেকে দুটি করে বাছুর হয়েছে। অনেকের গোয়ালে রয়েছে দুই থেকে তিনটি গরু। নিজেদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার দৈনিক গড়ে ৩ থেকে ৪ লিটার দুধ বিক্রি করতে পারছে। এতে পরিবারপ্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বিএনএফের দেওয়া ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকার একটি বকনা বাছুর বর্তমানে বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে এক থেকে দুই লাখ টাকার সম্পদে পরিণত হয়েছে। গরু পালন ও দুধ বিক্রির আয় দিয়ে অনেক পরিবার এখন নিজেদের জমি বন্ধক নিয়ে চাষাবাদ করছে। আগে যারা অন্যের জমিতে দিনমজুরি কিংবা অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন এলাকায় স্বাবলম্বী খামারি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
এ প্রকল্পের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো নারীর ক্ষমতায়ন। সুফলভোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী। গরু পালনের মাধ্যমে তাঁরা নিজেরাই আয় করছেন এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। দুধ বিক্রির অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হচ্ছে।
প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসই করতে আরডিসির প্রতিনিধিরা প্রতি মাসে অন্তত দুইবার সুফলভোগীদের বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় গরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচর্যা ও লালন-পালন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারকে স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করে দেওয়ার একটি কার্যকর উদ্যোগ এই গরু বিতরণ প্রকল্প। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতেও প্রকল্পটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
আরডিসির নির্বাহী প্রধান আব্দুর রহমান জানান, বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো অসহায় পরিবারগুলোর হাতে একটি স্থায়ী সম্পদ তুলে দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা। একটি গরু থেকে একাধিক গরু, আর সেই সম্পদ থেকে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা—এভাবেই মহেশপুরের অসহায় মানুষের জীবনে আশার আলো ছড়াচ্ছে এ প্রকল্প।



